সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হত্যাচেষ্টা মামলায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ–৩ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আটজনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই একজনকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নাইম আহমদের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর পশ্চিমপাড়া লম্বাহাটি গ্রামে। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাঁকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) এ রায় ঘোষণা করেন সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার। দীর্ঘ ২২ বছর পর এ মামলার রায় ঘোষণা করলেন আদালত। তবে মামলার ১ জন আসামি পলাতক আছেন। আসামীদের মধ্যে জেএমবি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী ও বিপুলকে ইতিমধ্যে অন্য মামলার রায়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আবুল হোসেন বলেন, দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত রায় দিয়েছেন। মামলায় ১২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৭ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলার একমাত্র আসামি সৈয়দ নাঈম আহমদ নিমুর বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় প্রদান করেছেন আদালত। ৯ আসামিকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়েছে। খালাস পাওয়া অন্য আসামিরা হলেন মুহিব উল্লা ওরফে মফিজুর রহমান (মফিজ), মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল (মাসুম বিল্লাহ ওরফে খাজা), আবদুল মাজেদ বাট (ইউসুফ বাট), নাজিউর রহমান ওরফে নাজমুল হক নাজু এবং মাওলানা তাজ উদ্দিন। তাঁদের মধ্যে তাজ উদ্দিন পলাতক আছেন। এ রায়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষ।
আদালত দুটি মামলাতেই আটজনকে খালাস ও নাইম আহমদকে দোষী সাব্যস্ত করেন। হত্যা মামলায় নাইমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় বিস্ফোরক মামলায় তাঁকে আলাদা কোনো সাজা দেওয়া হয়নি । আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার নয়জন আসামির মধ্যে পাঁচজন কারাগারে, তিনজন জামিনে ও একজন পলাতক। রায় ঘোষণার সময় পলাতক আসামি ছাড়া অন্য সবাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান আরিফুল হক চৌধুরী, জি কে গউছ ও লুৎফুজ্জামান বাবর। তাঁরা দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাঁদের এ মামলায় জড়ানো হয়েছিল। মিথ্যা মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাঁরা রায়ে সন্তুষ্ট।
অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নাইম আহমদের ভাই সৈয়দ মারুফ আহমদ আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা রায়ে সন্তুষ্ট নন। এই রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
এদিকে সৈয়দ নাঈম আহমেদ আরিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ। সংগঠনটির দাবি, একই মামলার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আসামিরা খালাস পেলেও দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর কারাভোগের পর কেবল নাঈমের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে, যা ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রিদওয়ান মাযহারী। বিবৃতিতে তিনি অবিলম্বে এ রায়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ, নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা এবং নাঈমের প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
চলতি বছরের (২০২৬ সাল) ৭ এপ্রিল একই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে চান বিচারক। শুনানীতে অংশ নিয়ে অভিযুক্তদের মধ্যে শ্রম, কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও সংসদের সরকার দলীয় হুইপ গোলাম কিবরিয়া গৌছ (জি কে গৌছ) , সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
নথি থেকে যা জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ জুন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নির্বাচনী এলাকা সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। গ্রেনেড বিস্ফোরণে যুবলীগের এক কর্মী ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং ২৯ জন আহত হন। হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ওই ঘটনায় এসআই হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন দিরাই থানায়। এরপর ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দুটি মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জি কে গউছসহ ১০ জনকে আসামি করে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি ও হরকাতুল জিহাদের নেতা মাওলানা শেখ আবদুস সালাম ২০২১ সালের নভেম্বরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে তাঁকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

