হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে সুফল মিলেছে দ্রুত বিচার পাইয়ে দেওয়ার। এমনকি নিষ্পত্তির সংখ্যাও বেড়েছে। গত দেড় মাসে বিশেষ বেঞ্চে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলা। বার ও বেঞ্চের সমন্বয়ে মিলছে দ্রুত বিচারের সুফল। যা আশাব্যঞ্জক। ডেথ রেফারেন্স মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে নজির সৃষ্টি করায় বিশেষ বেঞ্চে আরো ১৮টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির জন্য পাঠিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। অতীতে এ ধরনের ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগত। কিন্তু বিশেষ বেঞ্চে এসব মামলা বিরতিহীনভাবে শুনানি করায় এ সুফল মিলেছে বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিশেষ বেঞ্চে ধর্ষণ, হত্যাসহ জঘন্য অপরাধের ঘটনার ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তি হচ্ছে। এ ধরনের ঘৃণ্য ও জঘণ্য অপরাধের বিচার দ্রুত করা গেলে সমাজে ইতিবাচক বার্তা যায়। কারণ বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা গেলে অপরাধীরা ভয় পান। ফলে সমাজে অপরাধের পরিমাণ হ্রাস পায়।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলার ডেথ রেফারেন্স বিচারাধীন ছিল। বিচারপ্রার্থীরা যাতে দ্রুত বিচার পান সেজন্য প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন। যে বিশেষ বেঞ্চে স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এতে ভিকটিম ও আসামির পরিবার দ্রুত বিচার পাচ্ছেন। কারণ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে কনডেম সেলে থাকেন। এসব কনডেম সেলে থাকা আসামি ও তার পরিবার চান মামলাগুলো যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিশেষ বেঞ্চে মামলা পরিচালনার জন্য আমরা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে বিশেষ টিম গঠন করে দিয়েছিলাম। যারা বিরতিহীনভাবে মামলার বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বেঞ্চকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। যার সুফল মিলেছে স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক ডেথ রেফারেন্স মামলার নিষ্পত্তি।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। যে ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। মাত্র পাঁচ কার্যিদবসে বিচার শেষ করে নজির সৃষ্টি করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। অব্যাহতভাবে নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে সমাজে। আইনের প্রয়োগ ঘটানোর পরও কেন এ ধরনের জঘন্য হত্যাকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না তা ভাবিয়ে তুলে বিচার প্রশাসন ও সরকারকে।
সেই প্রেক্ষাপটে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় করা মামলাগুলোর বিচার দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকেও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিচারিক আদালতে এ ধরনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতিকে উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
রাষ্ট্রের এমন অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চকে বিশেষ বেঞ্চের এক্তিয়ার প্রদান করা হয়। যে বেঞ্চে শুধুমাত্র নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা থেকে উদ্ভুত ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।
গত ১১ জুন ঐ বেঞ্চে ২০টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হয়। গত ১৬ জুন বিশেষ বেঞ্চে প্রথম ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয়। যশোরের অভয়নগরের স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বিচারিক আদালত। ঐ রায় বাতিল চেয়ে আপিল করেন আসামি আব্দুল্লাহ। পাশাপাশি ডেথ রেফারেন্স আসে হাইকোর্টে। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট আসামিকে খালাস দেন। গত দেড় মাসে বিশেষ বেঞ্চে ১৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় বিচারিক আদালত ২০১৯ সালে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। কিন্তু সালের ক্রম অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স মামলা উচ্চ আদালতে শুনানি হয়। যার কারণে গত সাত বছর ধরে এসব ডেথ রেফারেন্স মামলা হাইকোর্টের শাখায় পড়ে ছিল। সম্প্রতি নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মত জঘন্য অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় এ ধরনের ডেথ রেফারেন্স মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে দায়িত্ব পালনকারী আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. ইমাম হোসেন তারেক বলেন, বার ও বেঞ্চের সমন্বয়ের কারণেই স্বল্প সময়ে এতগুলো ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। বেঞ্চের দুই জন বিচারক এ ধরনের ফাঁসির মামলার শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করতে পারঙ্গম। এছাড়া আমরা মামলার শুনানিতে কোনো ধরনের সময় নেইনি। বিরতিহীনভাবে শুনানি করেছি। আর এটা সম্ভব হয়েছে পূর্ব প্রস্তুতির কারণে। যখন কোনো মামলার শুনানির জন্য আসে তার আগে থেকেই সেই মামলার আদ্যোপান্ত পড়ে কোর্টে গিয়ে আমরা শুনানিতে অংশ নেই। ফলে তিন-চার দিনের মধ্যেই একটি মামলা রায়ের পর্যায়ে উপনীত হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্বল্প সময়ে এতগুলো মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর আমাদের আত্মবিশ্বাস আরো বেড়েছে। ফলে সামনে বিশেষ বেঞ্চে যত মামলা আসবে আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দ্রুততম সময়ে ভিকটিমকে বিচার পাইয়ে দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।

