Homeআলোচিত মামলাইতিহাসের পাতায় ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা’ 

ইতিহাসের পাতায় ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা’ 

কথায় বলে  ‘যেখানে মানুষের ক্ষমতা গিয়ে আটকে যায় সেখানে প্রকৃতি তার আসল ক্ষমতা দেখায়।’ বাংলাদেশ তথা অবিভক্ত ভারতবর্ষের অন্যতম আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা’  সেইটারই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আইনের ছাত্র হিসেবে এই মামলা নিয়ে যতবার ঘাটাঘাটি করেছি ততবার ভেবেছি এ ও কী সম্ভব। বিস্তর এই ঘটনাটি সংক্ষেপে আলোচনার চেষ্টা করবো। 

ঘটনাটি ছিল- তৎকালীন ভাওয়াল (বর্তমানে গাজীপুর) এস্টেটে একচেটিয়ে রাজত্ব করতো এক জমিদার পরিবার। সেই পরিবারের মেজ ছেলে তথা প্রজাদের মেজকুমার ছিল দ্বিমুখী চরিত্রের অধিকারী। তিনি একদিকে ছিলেন উদার, প্রজাবাৎসল, দানশীল, শিকারী এবং খেলোয়াড়। অন্যদিকে ছিলেন চরিত্রহীন, নারীলোলুপ, খামখেয়ালী এবং আপাদমস্তক একজন মাতাল ব্যক্তি। অতিরিক্ত যৌনাচারের জন্যে মেজকুমার ‘সিফিলিস’ নামক ভয়াবহ যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। ১৯০৯ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি। চিকিৎসার প্রয়োজন ও আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য ২৪ বছরের মেজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী পারিবারিক সিদ্ধান্তে ভারতের দার্জিলিং যান। সঙ্গী হন ২০ বছরের স্ত্রী (মেজরাণী) বিভাবতী দেবী, বিভাবতীর ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, পারিবারিক চিকিৎসক আশুতোষ দাস গুপ্ত এবং ব্যক্তিগত কর্মচারী মিলে ২৭ জন। দলবল নিয়ে ২৫ এপ্রিল মেজকুমার দার্জিলিং পৌঁছেন। মে মাসের শুরুতে মেজ কুমারের পেটে ব্যথাসহ নানা শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। প্রতিদিন দার্জিলিং থেকে জয়দেবপুরে তারবার্তার মাধ্যমে রাজার (মেজ কুমার) স্বাস্থ্যের খবর পাঠানো হতো।

প্রথম টেলিগ্রামে রাজার ৯৯ ডিগ্রি জ্বর, পরের টেলিগ্রামে জ্বর বৃদ্ধি, পেটে যন্ত্রণা, দার্জিলিং সিভিল সার্জন দেখে গেছেন ইত্যাদি খবর আসতে থাকে। ৭ মে সন্ধ্যা থেকে কুমারের অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। ওষুধ খাওয়া সত্ত্বেও বমি, রক্ত মিশ্রিত পায়খানা হতে থাকে।

৮ মে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে কোনো এক সময় রাজার মৃত্যু হয়েছে, বলা হয়। দার্জিলিংয়ের শ্মশানে তড়িঘড়ি করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয় বলে জানানো হয়। ১০মে মেজরাণী ও অন্যরা জয়দেবপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ১৮ মে মেজ কুমারের শ্রাদ্ধ করা হয়। গতানুগতিকভাবে এ কাহিনী এখানেই শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু ভাওয়ালের এ রাজার জীবন-মৃত্যুর কাহিনীর এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটেনি।

শ্রাদ্ধের দিনই গুঞ্জন ওঠে মেজকুমারের দেহের নাকি সৎকার হয়নি। ওই দিন শ্মশান ঘাটে মেজকুমারের লাশ নেওয়ার পর শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টি। এর মধ্যে লাশ ফেলে লোকজন শ্মশান ঘাট থেকে অন্যত্র আশ্রয় নেন। বৃষ্টির পর শ্মশানে গিয়ে তারা আর লাশটি দেখতে পাননি। ১৯২১ সালের ৪ মে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধে আত্মপ্রকাশ ঘটে গেরুয়া বসন পরা এক সন্ন্যাসীর। দেখতে অবিকল মেজ কুমারের মত। এক কান দুকান হয়ে খবরটি জয়দেবপুর ও কাশিমপুরে জমিদার বাড়িতে পৌঁছায়। কাশিমপুরের জমিদার অতুল প্রসাদ রায় চৌধুরি সন্ন্যাসীকে তার জমিদারিতে নিয়ে আসেন। সেখানে ধনী-গরীব, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভিড় লেগে যায়। যারা মেজকুমারকে কাছ থেকে চেনেন তারা তো অবাক। মানুষে মানুষে এত মিল হয় নাকি! প্রমাণ যত অকাট্যই থাক, মেজকুমারকে মেনে নেওয়া গুটিকয়েক লোকের জন্য সম্ভব ছিল না। এদের মধ্যে অন্যতম কুমারের স্ত্রী বিভাবতীর (মেজরাণীর) ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। কারণ, তিনি ইতোমধ্যে মেজকুমারের জীবন বীমার ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া মেজকুমারের স্ত্রী হিসাবে বিভাবতী জমিদারির পক্ষ থেকে বাৎসরিক লক্ষাধিক টাকার যে ভাতা পেতেন তার পুরোটাই গ্রহণ করতেন সত্যেন্দ্রনাথ। তাই মেজকুমারের ফেরা সত্যেন্দ্রর জন্য হলো অশনি সংকেত। সন্ন্যাসীর আবির্ভাবের সময় জমিদারবাড়ির উত্তরসূরির মধ্যে শুধু ছোট কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায় বেঁচে ছিলেন। তিনি সন্ন্যাসীর পরিচয় নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে নিরবতা পালন করেন। ১৯২৪ সালের আগষ্ট মাসে কলকাতার ভবানীপুরের হরিশ মুখার্জীর একটি বাড়িতে অবস্থানকালে বড়রাণী (মেজকুমারের বড় ভাই রণেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরির স্ত্রী) সূর্যবালা দেবী সন্ন্যাসীকে দেবর বলে চিনতে পারেন। এ ছাড়া মেজরাণীর কয়েকজন আত্মীয়ও মেজ কুমারকে চিনতে পারেন এবং তার পক্ষে সাক্ষ্য দেন। আইনজীবী ও স্থানীয় জমিদারদের নিয়ে সন্ন্যাসী সশরীরে ঢাকা বোর্ড অব রেভিনিউতে হাজির হয়ে তার পরিচয় উদঘাটনের জন্য ১৯২৬ সালের ৮ ডিসেম্বর আবেদন জানান। কিন্তু তা অগ্রাহ্য হয়। এ আবেদনেও কর্ণপাত না করায় ১৯৩০ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার অতিরিক্ত জজ আদালতে নিজের স্বীকৃতি ও জমিদারির অংশ দাবি করে মামলা করেন সন্ন্যাসী। মামলার শুরুতেই প্রতিপক্ষের মূল ব্যক্তি সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি দার্জিলিং সিভিল সার্জনের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মেজকুমারের মৃত্যু সনদ আদালতে দাখিল করেন।

এছাড়া দার্জিলিং আবহাওয়া অফিস থেকে মেজকুমারের মৃত্যুর দিনের আবহাওয়ার রিপোর্ট সংগ্রহ করে আদালতে জমা দেন। এর মাধ্যমে সত্যেন্দ্রনাথ প্রমাণের চেষ্টা করেন কুমারের মৃত্যু দিনের আবহাওয়া স্বাভাবিক ছিল। পরে বিচারক পান্নালাল বসু ১৯৩৬ সালের ২৪ আগস্ট ৫৩২ পৃষ্ঠার রায় দেন। উভয় পক্ষে সাক্ষ্য দেন ১ হাজার ৫৪৮ জন। এর মধ্যে বাদী পক্ষে ১০৬৯ জন। প্রমাণ হয় আলোচিত সন্ন্যাসীই ভাওয়ালের মেজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়। বিবাদিপক্ষ কোলকাতা হাইকোর্টে রায় চ্যালেঞ্জ করে আপিল করে। ১৯৪০ সালের ২৯ আগস্ট বিচারপতি লিওনার্ড ক্যাস্টেলো আগের রায়ই বহাল রেখে আদেশ দেন। আপিলে হেরে বিবাদিপক্ষ লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে পূণরায় আপিল করেন। যদিও লাভ হয়নি। ১৯৪৬ সালের ৩০ জুলাই প্রিভি কাউন্সিল যে রায় দেন তাতে তা রাজার অনুকূলেই যায়। মামলাটি শুরু হয় ১৯৩০ সালে আর শেষ হয় ১৯৪৬ সালে। আদালতে প্রকাশ্যে বিচারকার্য শুরু হয় ১৯৩৩ সালের ২৭ নভেম্বর। ১৯৩৬ সালের ২১ মে পর্যন্ত শুনানি চলে। সেখানে উভয় পক্ষের ১৫৪৮ জন সাক্ষ্য দেন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েক জনের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য বিলেতেও কমিশন বসে। মামলা চলার সময় ঢাকার চারটি পত্রিকা বিবরণী প্রকাশ করত এবং ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা বিকেলে বিশেষ সংস্করণ বের করত। প্রিভিয়ার্স কাউন্সিলের রায়ের পর মাত্র তিনদিন বেঁচে ছিলেন মেজকুমার (অবশ্য মেজকুমারের মৃত্যুর খবরটি ৫ আগষ্ট জয়দেবপুর যেন মামলার চূড়ান্ত রায়ের জন্যেই বেঁচে ছিলেন ভাওয়াল রাজ্যের মেজকুমার। এই মামলা এবং তার রায় নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক মতামত আছে৷ মেজকুমারের মৃত্যুর পর তার বিরোধীরা বলতে শুরু করে মিথ্যা সাক্ষ্যদানের জন্যে পাপেই মারা গিয়েছে সন্ন্যাসী৷ তবে সব মতামত ছাপিয়ে ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা’ যে ইতিহাসের অনন্য দলিল হিসেবে রয়ে গিয়েছে তা একবাক্যে স্বীকার করতেই হবে।

এই রায় নিয়ে মতামতটি লিখেছেন শাদমান ইয়াসার।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments