৪৩ তম বিসিএস নন-ক্যাডারে মেধার ভিত্তিতে প্রার্থীদের ফলাফল প্রকাশে পিএসসিকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ৬০ দিনের মধ্যে সরকার কর্তৃক অধিযাচিত সকল পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া যোগ্যতা সাপেক্ষে ৪৬৫ জন রিট আবেদনকারীদের সুপারিশ বিবেচনা করতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন, ২০২৬) বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন।
৪৩তম বিসিএসের ৪৬৫ জন নন-ক্যাডার প্রার্থীর দায়ের করা রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত এই নির্দেশনা দিয়ে রিট আবেদনটি নিষ্পত্তি করেন।
ইতোপূর্বে ২০২৪ সালে ৪৩তম বিসিএস থেকে ৬৪২ জনকে নন ক্যাডারের বিভিন্ন পদে নিয়োগের সুপারিশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট । একই সঙ্গে ৪৪তম বিসিএসের ফল প্রকাশ না করা পর্যন্ত যত নন ক্যাডার শূন্যপদ হবে তার তালিকা করে ৪৩তম বিসিএসে উত্তীর্ণ নন-ক্যাডার প্রার্থীদের থেকে নিয়োগের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। গত ২৯ জানুয়ারি ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও ক্যাডারপদে সুপারিশ পায়নি এমন প্রার্থীদের মধ্যে ৪৩তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মো: মারুফ হোসেন, মো. হাসান সরদারসহ ৫০০ জন চাকরি প্রার্থী এই রিট আবেদন দায়ের করেন। পরবর্তীতে আরো ২৭৩ জন আবেদনকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। তবে বর্তমানে ৪৬৫ জন রিট আবেদনকারী রয়েছেন। রিটে পিএসসি চেয়ারম্যান, জনপ্রশাসন সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ হাইকোর্ট রুল ও আদেশ জারি করেছিলেন।
মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ২০২৫ মে মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রেরিত নন ক্যাডার পদগুলোর সমন্বয় করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৮৫০১ টি পদে ৪৩ তম বিসিএস এর নন ক্যাডার প্রার্থীদের মধ্য থেকে সুপারিশ করার জন্য বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে নির্দেশ দেয়। সর্বমোট ১২৫২৫ টি নবম থেকে ১২ তম গ্রেড এর নন ক্যাডার পদে ৪৩ তম বিসিএসের নন ক্যাডার প্রার্থীদের মধ্য থেকে সুপারিশ করার জন্য বিভিন্ন সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পিএসসিকে নির্দেশনা দেন। কিন্তু পিএসসি নন ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা২০১০ এবং ২০২৩ অনুযায়ী মেধার ভিত্তিতে নন ক্যাডার প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ না করে ৬৪২ জনকে সরাসরি সুপারিশ করে। আদালত এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা এবং আইনি সংগতিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহামমদ কাওছার, বায়েজিদ হোসাইন, মোঃ মাকসুদুর রহমান এবং মারুফ হোসেন তমাল। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পক্ষে আইনজীবী মোঃ মনিরুজ্জামান আদালতে শুনানি করেন।
রীট আবেদনে বলা হয়, ৪৩ তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর প্রকাশিত হয়। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পরে ঐ বিসিএসে সর্বমোট ৯৮৪১ জন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পিএসসি গত ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৩ নন ক্যাডার পদে চাকুরী করতে ইচ্ছুক এমন প্রার্থীদের অনলাইনে পছন্দক্রম আহ্বান করে। পরবর্তীতে গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩ বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিস পদে ২১৬৩ জনকে এবং একই সাথে ৬৪২ জনকে বিভিন্ন নন ক্যাডার পদে সুপারিশ করা হয়। অথচ নন ক্যাডার মেধা তালিকা প্রকাশ করা হয় নি। যেটি ‘নন ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা ২০১০, সংশোধিত ‘বিধিমালা ২০১৪’ এর পরিপন্থী।
৪৩ তম বিসিএস সার্কুলারে বলা হয়েছিল যে, সংশ্লিষ্ট বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে বঞ্চিত নন ক্যাডার প্রার্থীদের নন ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা ২০১০, সংশোধিত ‘বিধিমালা ২০১৪’ অনুযায়ী সুপারিশ করা হবে। উক্ত বিধি অনুযায়ী পিএসসি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আসা পদগুলিকে সংরক্ষণ করবেন এবং পরবর্তী বিসিএস এর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিসিএস এর নন ক্যাডার প্রার্থীদের ধাপে ধাপে সুপারিশ করবেন। কিন্তু পিএসসি নন ক্যাডারদের মেধা তালিকা প্রকাশ না করেই সম্পূর্ণ অন্যায় এবং বিধি বহির্ভূতভাবে ৬৪২ জনকে বিভিন্ন নন করার পদে সুপারিশ করেছে যা আইনের দৃষ্টিতে অন্যায় যা বাতিল করা আবশ্যক।
রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বিচার বার্তাকে বলেন, “নন ক্যাডার প্রার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ না করা এবং ফলাফল প্রকাশের আগেই নন ক্যাডার প্রার্থীদেরপছন্দ ক্রম আহ্বান করা সংশ্লিষ্ট নন ক্যাডার নিয়োগ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুঃখজনক। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে মেধাবী হাজার হাজার উত্তীর্ণ চাকুরী প্রার্থীদের বিষয়টি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা পিএসসির সাংবিধানিক দায়িত্ব। ইতিমধ্যে অনেক চাকরি প্রার্থীর বয়সসীমা অতিক্রম হওয়ায় তারা অন্য কোন সরকারি চাকরিতে আবেদনও করতে পারবেন না। সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ গুলোতে এই অবৈধ এবং অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মাননীয় আদালত বিষয় প্রকাশ করেছেন।
ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, আদালত তাঁর রায়ে সুপারিশ প্রক্রিয়ায় সুস্পষ্ট অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেন, “পিএসসি সরকারি নিয়োগের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তারা সকল মেধাবী এবং চাকুরী প্রার্থী তথা সকল জনগণের আস্থা ভঙ্গ করেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।”
গত ২৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত ৪৩তম বিসিএস এর নন ক্যাডারের ফলাফল বাতিল, ৪৩ তম বিসিএস নন ক্যাডার প্রার্থীদের মেধা তালিকা প্রকাশ এবং ৪৪তম বিসিএস এর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত শুন্য হওয়া নন ক্যাডার পদে ৪৩ তম বিসিএস নন ক্যাডারদের সুপারিশ অব্যাহত রাখার জন্য গত ১৬ জানুয়ারি) বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান সহ ০৩ জনকে রেজিস্টার্ড ডাক যোগে নোটিশটি পাঠানো হয়েছিলো। নোটিশের কোন জবাব না পেয়ে রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়েছিল।

