HomeUncategorizedআওয়ামী বাহিনী লাশ দাফনের জন্য মাত্র ৪০ মিনিট সময় দিয়েছিলো

আওয়ামী বাহিনী লাশ দাফনের জন্য মাত্র ৪০ মিনিট সময় দিয়েছিলো

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিতে নিহত হন রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ। সন্তান হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন তার বাবা শহীদুল ইসলাম ভুঁইয়া। সন্তান হারানোর বিয়োগান্তক বর্ণনায় অশ্রুসিক্ত হন আদালত কক্ষে উপস্থিত অনেকেই। ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে যা বললেন শ‌হিদুল ইসলাম ভুঁইয়া।

আমার একমাত্র ছেলে ফারহান ফাইয়াজ। সে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলো। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকাল ১০টায় সে বাসা থেকে বের হয়ে তার কলেজে যায়। ওখান থেকে সে তার বন্ধুদেরসহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে মিছিল সহকারে মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে অবস্থান নেয়। তারা ছিলো নিরস্ত্র। তাদের হাতে কোনো লাঠি সোটা ছিলো না। তারা শান্তিপ্রিয়ভাবে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই সময়ে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী, আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের উপরে চড়াও হয়। এক পর্যায়ে পুলিশের সহযোগীতায় আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্রদের উপরে নির্বিচারে গুলি চালায়।

শহীদুল ইসলাম বলেন, এসময় আমার একমাত্র ছেলের বুকে একটি বুলেট ঢুকে যায়। খবর শুনে আমি তখন প্রায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন দৌড়ে অফিস থেকে নেমে ধানমন্ডি-২৭ এর উদ্দেশ্যে রওনা হই। একই পথে আমার বাসা কাকরাইল সার্কিট হাউস রোডে গিয়ে আমি আমার স্ত্রী ও মেয়েকে ঘটনাটা বলে আমি ধানমন্ডি-২৭ এর উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আমার স্ত্রী ও মেয়েকে সাথে নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিস্থিতির কারণে আমি নিতে পারিনি। আমি কিছুটা পথ হেটে, কিছুটা পথ দৌড়ে এবং কিছুটা পথ রিক্সায় করে যাওয়ার পথে আরেকটা ফোন আসে যে, আমার ছেলেকে লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। আমাকেও সেখানে যেতে বলেছে। আমি সিটি হাসপাতাল পৌঁছানোর আগেই ফারহানের মামা মিজানুর রহমানকে ফোন করি। তার বাসা মোহাম্মদপুরে। আমার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ফারহানের মামা মিজানুর রহমান তার স্ত্রী সহ লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে পৌঁছায়।

জবানবন্দিত তিনি বলেন, আমি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর হাসপাতালে এক বীভৎস অবস্থা দেখতে পাই। অনেক ছাত্র রক্তে রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। আমি দৌড়ে আইসিইউতে উঠে দেখলাম ফারহানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম। একপর্যায়ে ডাক্তার ওর মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিলো এবং কাপড় দিয়ে ওর মুখ ঢেকে দিলো। তাতে আমি বুঝলাম আমার ছেলে আর নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে মৃত্যু সনদ দিয়েছিলো তাতে লেখা ছিলো সে ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছে।

খবর পেয়ে অনেক অভিভাবক, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং স্কুলের প্রিন্সিপাল হাসপাতালে উপস্থিত হয় এবং কলেজের মাঠে একটা জানাজা দেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ জানায়। আমি সম্মত হই। কিন্তু হাসপাতাল আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশ এমনভাবে ঘিরে রেখেছিলো যে, বের হওয়া যাচ্ছিলো না। আমরা অনেক কষ্টে হাসপাতালের পিছনের গেট দিয়ে ফারহানের লাশ নিয়ে আল মারকাজুল লাশ দাফন কেন্দ্রে নিয়ে তার গোছল সম্পন্ন করাই। সেখান থেকে তাকে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ মাঠে নিয়ে যাই। সেখানে

বিকাল সাড়ে ৫টায় সময় তার প্রথম নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে ফ্রিজিং গাড়ী যোগে ফারহানের লাশ নিয়ে আমরা আমাদের গ্রামের বাড়ী বরপার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। পথিমধ্যে কাকরাইল সার্কিট হাউস রোড থেকে আমার স্ত্রী ও মেয়েকে আরেকটি মাইক্রোবাস যোগে রওনা হই। প্রথমে কাকরাইল মোড়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর বাধার সম্মুখিন হই। দ্বিতীয়বার আমরা যাত্রাবাড়ী মোড়ে আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক বাধার সম্মুখিন হই। আমাদের গাড়ীর গ্লাস ভাংচুর করা হয়। অনেক কষ্টে আমরা যেতে পেরেছি। তারা সম্ভবত তার লাশটা নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে পৌঁছার পর সেখানকার স্থানীয় আওয়ামী বাহিনী লাশ দাফন করার জন্য আমাদেরকে মাত্র ৪০ মিনিট সময় দিয়েছিলো। রাত আনুমানিক ৯ টার দিকে তার জানাজা সম্পন্ন করে তাকে বরপা সামাজিক কবরস্থানে কবরস্থ করি।

তিনি আরো বলেন, আমার একমাত্র ছেলের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী আমি তাদের শাস্তি দাবি করছি। আমি যাদেরকে আসামী করেছি। ঐ দিন ঘটনার পরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ভিডিও ফুটেজ, পত্রপত্রিকার মাধ্যমে যাদেরকে দেখেছি ও নাম জানতে পেরেছি। ফারহানের সাথে যারা আন্দোলনে ছিলো তাদের মাধ্যমেও জানতে পেরেছি কারা এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। যথা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, এডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়াদ্দার, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি রৌশানুল হক সৈকত, ঢাকা উত্তরের আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সাত্তার, তোফায়েল আহম্মেদ, মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন, সৈয়দ হাসান নূর রাষ্ট্রন, ইসমাইল হোসেন, মোঃ মাসুদুর রহমান বিপ্লব, ফজলে রাব্বি, এবং আহাদ হাসান সহ অজ্ঞাত আরো ৫/৭ জন আছে যাদের নাম এই মূহুর্তে মনে নেই। এরা সবাই সেদিন গুলি বর্ষন করেছিলো সেটা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments