মোঃ করমুল্লাহ্
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও চট্টগ্রাম জজ কোর্ট
ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট সম্প্রতি এক যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কোনো আইনজীবী তাঁর মক্কেলের কাছ থেকে প্রাপ্ত আইনি ফি অপরাধের লব্ধ অর্থ নয়। সাইবার সেল বা পুলিশ শুধুমাত্র মক্কেলের অপরাধের সূত্র ধরে আইনজীবীর পুরো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে না। এই রায় আইনজীবী সমাজের পেশাগত স্বাধীনতা ও বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি রক্ষায় এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।
আইনজীবী এবং মক্কেলের মধ্যকার সম্পর্কটি সম্পূর্ণ পেশাগত এবং বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। একজন চিকিৎসক যেমন অপরাধী বা সাধারণ মানুষ—সবার চিকিৎসা করেন, ঠিক তেমনি একজন আইনজীবীর দায়িত্ব হলো তাঁর মক্কেলের আইনি অধিকার আদালতে তুলে ধরা, মক্কেল যত বড় অপরাধীই হোন না কেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের উত্তর প্রদেশ পুলিশের সাইবার সেল একাধিক আইনজীবীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে তাদের পেশাগত জীবনকে সংকটে ফেলে দিয়েছে। সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
মামলাটি হলো আয়ুষ বাজপেয়ী বনাম উত্তর প্রদেশ রাজ্য ও অন্যান্য। আবেদনকারী আয়ুষ বাজপেয়ী পেশায় একজন আইনজীবী। তাঁর স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার কানপুর শাখায় একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। উত্তর প্রদেশ পুলিশের সাইবার সেল একটি আর্থিক জালিয়াতি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে দেখতে পায় যে, ওই মামলার একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর আইনজীবী আয়ুষ বাজপেয়ীকে আইনি ফি বাবদ কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। পুলিশ কালবিলম্ব না করে পুরো টাকাটিকে অপরাধের অংশ বিবেচনা করে আইনজীবীর সম্পূর্ণ ব্যাংক অ্যাকাউন্টটিই ফ্রিজ করে দেয়। অথচ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, তাঁর অ্যাকাউন্টে মোট ব্যালেন্স ছিল মাত্র ১,০৩,০৭১ (এক লক্ষ তিন হাজার একাত্তর) টাকা এবং লেনদেনগুলো ছিল অত্যন্ত সাধারণ—যেমন ১৮ই মার্চ ২০২৬-এ ২০,০০০ টাকা এবং ২৩শে এপ্রিল ২০২৬-এ ৩,৭০০ টাকার দুটি ছোট ক্রেডিট। পুলিশের এই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ আইনজীবী হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
মামলাটির শুনানিতে বিচারপতি জে. জে. মুনির এবং বিচারপতি অরুণ কুমারের ডিভিশন বেঞ্চ পুলিশের এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। আদালত বলেন, একজন আইনজীবী এমন একজন অভিযুক্তকে ডিফেন্ড করতে পারেন, যিনি সত্যিই কোনো বড় স্ক্যাম বা জালিয়াতির সাথে জড়িত। কিন্তু যখন সেই অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর আইনজীবীকে ফি বাবদ টাকা পাঠান, তখন সেই অর্থকে অপরাধের লব্ধ অর্থ বলা যায় না। এটি আইনজীবীর বৈধ পারিশ্রমিক, যা তাঁর কাজ সম্পন্ন করার পর সততার সাথে অর্জিত হয়।
আদালত আরও বলেন, এই আদালতের পূর্ববর্তী দুটি ডিভিশন বেঞ্চের রায়—খালসা মেডিকেল স্টোর ও মারুফা বেগম মামলা—দ্বারা এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, কোনো প্রতারণামূলক লেনদেনের কারণে সাইবার সেল পুরো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে না। শুধুমাত্র সেই অংশটুকু ফ্রিজ করা যেতে পারে যা সন্দেহজনক লেনদেন বা অপরাধের সাথে সম্পর্কিত।
আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মক্কেলের দেওয়া ফি-কে যদি সাইবার জালিয়াতি বা অন্য কোনো অপরাধের লব্ধ অর্থ হিসেবে গণ্য করে ঢালাওভাবে আইনজীবীর অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়, তাহলে আইনজীবীদের পক্ষে অ্যাডভোকেটস অ্যাক্টের অধীনে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে স্বয়ং আদালতের কার্যক্রমই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়বে।
তবে আদালত একটি ব্যতিক্রমও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে, যদি কোনো আইনজীবী নিজেই কোনো অপরাধে জড়িত থাকেন এবং তাঁর অ্যাকাউন্টে তাঁর নিজের অপরাধের অর্থ জমা হয়।
আদালত কেবল মামলার তাৎক্ষণিক সমাধানই করেননি, বরং ভবিষ্যতে যেন কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আইনজীবীদের এভাবে হয়রানি করতে না পারেন, সেজন্য স্থায়ী ব্যবস্থার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। আদালত উত্তর প্রদেশের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবকে (স্বরাষ্ট্র) আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত হলফনামা দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই হলফনামায় পুলিশকে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দিতে হবে যে, কীভাবে আইনজীবীদের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের বিষয়টি সামলানো হবে, যাতে আদালতের কাজে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। এছাড়া আদালত নোটিশ ইস্যু করেছে এবং মামলাটি আগামী ১৭ই জুলাই ২০২৬-এর জন্য নতুন শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে।
এই রায়টি কেবল আয়ুষ বাজপেয়ী মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং এটি সমগ্র আইনজীবী সমাজের জন্য এক ঐতিহাসিক সুরক্ষা। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মক্কেল যত বড় অপরাধীই হোন, তাঁর দেওয়া ফি কখনো অপরাধের অর্থ হতে পারে না—যতক্ষণ না আইনজীবী নিজে সেই অপরাধে জড়িত থাকেন। এটি পুলিশ ও সাইবার সেলের স্বেচ্ছাচারী অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। পাশাপাশি, এটি আইনজীবীদের পেশাগত স্বাধীনতা ও বিচার ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম রক্ষায় একটি শক্তিশালী আইনি নজির হিসেবে কাজ করবে।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই রায় আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করেছে। এটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, আইনজীবীদের কাজ করার স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত না করলে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এই ঐতিহাসিক নজির আগামী দিনে উপমহাদেশীয় বিচার ব্যবস্থায় আইনজীবীদের অধিকার রক্ষায় এক অত্যন্ত শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
রেফারেন্স: এলাহাবাদ হাইকোর্টের রিট-সি নম্বর ২৪৫৮৯/২০২৬ মামলা; খালসা মেডিকেল স্টোর বনাম আরবিআই (২০২৬) এবং মারুফা বেগম বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (২০২৫)।

