Homeআপিল বিভাগআপনি ছিলেন একজন আদর্শ বিচারপতি : বিদায় সংর্বধনায় বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের উদ্দেশ্যে...

আপনি ছিলেন একজন আদর্শ বিচারপতি : বিদায় সংর্বধনায় বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের উদ্দেশ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল

বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। আজ মঙ্গলবার ছিল তার বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবস। প্রায় দুই যুগ বিচারপতি আসনে কাটিয়েছেন তিনি। নানা আদেশ ও রায় এসেছে তার আদালত থেকে। ঐতিহ্য ও রীতি অনুযায়ী শেষ কর্মদিবসে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করেন অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের কর্মময় জীবনের নানা দিক নিয়ে বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। পুরো বক্তব্য তুলে ধরা হল বিচার বার্তার পাঠকদের জন্য।

আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি মাননীয় বিচারপতি জনাব মোঃ আশফাকুল ইসলাম আপনাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাবার জন্য। যেহেতু আজই আপনার কর্মদিবসের শেষ দিন। বিচারপতি হিসাবে বেঞ্চে আসীন অবস্থায় আপনাকে আগামীতে আর পাবো না একারনেই আজ এ আয়োজন।

মাননীয় বিচারপতি মোঃ আশফাকুল ইসলাম ১৯৫৯ সালের ১৫ জুলাই ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ওয়ারীর র‍্যাঙ্কিন স্ট্রিটের কবিতাঙ্গনে এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার খলিলপুর গ্রামে। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রাক্তন উপ-রাষ্ট্রপতি মরহুম বিচারপতি এ. কে. এম. নূরুল ইসলাম এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত স্বনামধন্য কবি ও কথাসাহিত্যিক বেগম জাহানারা আরজুর তৃতীয় সন্তান। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার এক সমৃদ্ধ পারিবারিক পরিবেশে তাঁর শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়, যা পরবর্তীকালে তাঁর ব্যক্তিত্ব, মনন ও জীবনদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

মোঃ আশফাকুল ইসলাম গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ১৯৮১ সালে এল.এল.বি. (অনার্স) এবং ১৯৮২ সালে এল.এল.এম. ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চতর আইনশিক্ষার অংশ হিসেবে তিনি ১৯৮৪-৮৫ সালে ভারতের নয়া দিল্লিস্থ Institute of Constitutional and Parliamentary Studies থেকে বৃত্তি সহকারে সংবিধান বিষয়ক আইনে ফেলোশিপ ও বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করেন।

১৯৮৩ সালে তিনি ঢাকা বারে অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে ঢাকা জজ কোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সাল থেকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রায় দুই দশক অত্যন্ত নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং একজন সফল আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

বিচারপতি ইসলাম ড. এম. জহিরের তত্ত্বাবধানে গবেষণা-সহযোগী (Research Fellow) হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া তিনি দেশের প্রখ্যাত আইনজীবী সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার রফিকুল হক, সিনিয়র অ্যাডভোকেট জনাব খলিলুর রহমান এবং বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের জুনিয়র হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর এই দীর্ঘ পেশাগত জীবন তাঁকে বিচারবোধ, আইনজ্ঞতা ও পেশাগত উৎকর্ষতার এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।

তিনি ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত হাইস্পিড গ্রুপ অব কোম্পানিজ, থাই অ্যালুমিনিয়াম বাংলাদেশ লিমিটেড এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা (Legal Adviser) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে উন্নীত হন। ৮ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং বর্তমানে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিচারপতি মোঃ আশফাকুল ইসলাম দেশ-বিদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও বিচারবিষয়ক আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত Judicial Development Program-এ এবং ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত 3rd South Asia Chief Justices’ Roundtable on Environmental Justice-এ অংশগ্রহণ করেন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি হিসেবে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত International Criminal Court পরিদর্শন করেন এবং সেখানকার বিচারকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ইতালি, ভারত, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, চেক প্রজাতন্ত্র, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবসহ বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে বিচারপতি মোঃ আশফাকুল ইসলাম পাঁচ সন্তানের জনক। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শারমিন ইসলাম তাঁর সহধর্মিণী। শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, খেলাধুলা ও ভ্রমণ-এসবই তাঁদের উভয়ের প্রিয় অনুষঙ্গ; বিশেষত সংগীতের প্রতি বিচারপতি ইসলামের রয়েছে গভীর অনুরাগ।

আইনজ্ঞ ও বিচারপতি পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি একজন সংবেদনশীল কবিও। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘গন্তব্যহীন এক চিঠি’ ও “অতীত অতল” পাঠক মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। কবি হিসেবে তাঁর অনুভবের জগৎ এবং বিচারক হিসেবে তাঁর ন্যায়বোধ- এই দুইয়ের সৃজনশীল সমন্বয় তাঁর ব্যক্তিত্বকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র মাত্রা।

ওয়ারীর বিখ্যাত বাসভবন কবিতাঙ্গনের আলোকিত প্রাঙ্গণ থেকে যাত্রা শুরু করে এ দেশের ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ আসনে তাঁর আরোহণ যেন কবিত্ব ও আইনবোধের এক অনন্য সমাহার। পারিবারিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিগত মেধা, অধ্যবসায় ও কর্মনিষ্ঠার সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিরল প্রজ্ঞাময় ব্যক্তিসত্তা। ন্যায়, মানবিকতা ও নান্দনিকতার দীপ্ত সংলাপে তিনি হয়ে উঠেছেন যুগপৎভাবে আইন, সাহিত্য ও সৌন্দর্যবোধের এক কীর্তিমান প্রতিনিধি।

পরিশেষে, বলতে চাই আপনি ছিলেন একজন আদর্শ বিচারপতি। আপনি ধৈর্য ধরে মামলা শুনতেন এবং সব সময় চেষ্টা করতেন ন্যায় সম্মত বিচার করতে। আজ এ বিদায় বেলায় আপনার সুস্বাস্থ্য ও সুখী জীবন কামনা করে আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমার বক্তব্য শেষ করছি। আপনি দীর্ঘজীবী হউন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments