Homeসাক্ষাতকারআইন-আদালতই পারে হতাশাগ্রস্ত নাগরিককে কিছুটা স্বস্তির পরশ দিতে

আইন-আদালতই পারে হতাশাগ্রস্ত নাগরিককে কিছুটা স্বস্তির পরশ দিতে

লেখা: এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া

জেড আই খান পান্না একজন বয়োজ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি ও ব্লাস্টের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, সর্বোপরি প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার একজন মানুষ। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাও। বরিশাল অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধে আমার মামা ছিলেন তাঁর সহযোদ্ধা এবং যুদ্ধকালীন সেই সম্পর্কের গভীরতা এখনো বজায় থাকায় তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও সম্মান অনেকের থেকে কিছুটা ভিন্ন। তাঁর একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে প্রথম আলোর ১২ ফেব্রুয়ারি, যেখানে তিনি আদালতের দুর্নীতি নিয়ে অকপটে কিছু বাস্তব দৃশ্য সামনে এনেছেন, যা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না। তাঁর সাক্ষাৎকারের অনেক বিষয়ের সঙ্গেই যেমন দ্বিমত নেই, তারপরও কিছু বিষয়ে যৌক্তিক তর্কের দাবি রাখে বলেই এ লেখার অবতারণা।

সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে প্রথম আলোর একটি প্রশ্ন ছিল এ রকম, ‘আইনজীবীরা কখনো কখনো বিচারকসহ আদালতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নানা রকম দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। এই অভিযোগগুলোর সুরাহা না হলে আদালতের ওপর বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের আস্থা কি থাকবে? এ ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে?’

প্রশ্নের মূল অংশ মূলত প্রথমটি। দ্বিতীয়টি প্রথম অংশের সম্পূরক। তবে প্রশ্নকর্তার প্রশ্নটির মধ্যে উত্তরটি কেমন হবে, তা অনুমান করা যায়। জেড আই খান পান্নাও তাই উত্তর দিয়েছেন এভাবে, ‘বিন্দুমাত্র আস্থা থাকবে না।’ এ রকম হলে আস্থা থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কেন আস্থা থাকবে না, সেই বিষয়ে ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘কেউ কি বলতে পারবেন তিনি আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন? আমি বারবার বলি, আমাদের যে আইন, সেটা মাকড়সার জালের মতো। এখানে ছোটখাটো পোকামাকড় ধরা পড়বে, কিন্তু যদি সেটা বড় হয়, তাহলে মাকড়সার জালই থাকবে না। তাঁদের জন্য আইনকানুন নয়। যাঁরা ব্যাংক ডাকাতি করেছেন, তাঁদের জন্য কি কোনো আইনকানুন আছে দেশে? এমনকি যাঁরা বড় বড় ঋণখেলাপি, তাঁদের নাম খেলাপিদের তালিকাতেই আসে না।’

সুপ্রিম কোর্টের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৯ লাখ ৩৩ হাজার ১৮৬টি। এই প্রায় ৪০ লাখ মামলার সঙ্গে কম করে হলেও দুজন মানুষ সম্পর্কিত। কেননা, বাদী, আবেদনকারী বিবাদী বা প্রতিপক্ষ—যাই হোক না কেন দুজন ছাড়া তো আর মামলা হয় না। যদিও কোনো কোনো মামলায় কয়েক শ মানুষও আসামি হতে পারে, বিডিআর বিদ্রোহ মামলা তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তাহলে ৪০ লাখকে ২ দিয়ে গুণ দিলে ৮০ লাখ। যদিও আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কেবল একজন বাদী পাওয়া গেলেও কেবল একজন প্রতিপক্ষ পাওয়া মুশকিল, এমনকি কয়েক শ জন মিলেও মামলার বাদী হতে দেখা যায়। তাই ৪০ লাখ মামলার সঙ্গে সরাসরি দেড় কোটি মানুষ সম্পর্কিত ধরে নিলে এতগুলো মানুষ সবাই ন্যায়বিচার বঞ্চিত!

অন্যভাবে দেখলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ, ৬৪ জেলা পর্যায়ের জেলা ও দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন এলাকায় অবস্থিত মহানগর দায়রা জজ, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তাঁদের অধীন অন্যান্য আদালত, এমনকি যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনালসহ অন্যান্য ট্রাইব্যুনাল কিংবা প্রান্তিক পর্যায়ের চৌকি আদালতের সব বিচারপতি কিংবা বিচারক যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, তারা কোনো ন্যায়বিচার করেন না! অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশের অধস্তন আদালত প্রতিদিন যে হাজার হাজার আদেশ বা রায় দেন, তার সব কটি ভুল, ন্যায়বিচারপরিপন্থী!

জেড আই খান পান্নার বক্তব্য, ‘আমি বারবার বলি, আমাদের যে আইন, সেটা মাকড়সার জালের মতো। এখানে ছোটখাটো পোকামাকড় ধরা পড়বে, কিন্তু যদি সেটা বড় হয়, তাহলে মাকড়সার জালই থাকবে না। তাঁদের জন্য আইনকানুন নয়।’ কথাটির সঙ্গে কিছুটা সহমত থাকলেও এটাও ঠিক মাকড়সার জাল এক নিখুঁত শৈল্পিক ফাঁদ। এরূপ নিখুঁত জালের ফাঁদ ওজনেই ছেঁড়ে তা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি কোথাও কোথাও দুর্বলতা থাকলেও সেই জাল এখন আগের তুলনায় অনেক শক্ত, অহরহ যা চোখে পড়ে পত্রিকা ঘাঁটলেই। এমন অনেক নজির আছে, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মী কিংবা রাঘব বোয়ালেরা লটকে আছেন ফাঁদে।

আমরা সবাই জানি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার কথা। হত্যাকাণ্ড নিয়ে হওয়া মামলায় আসামি ছিলেন ২৫ জন। সবাই তাঁরা ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মী, প্রত্যেকেই বুয়েটের মেধাবী ছাত্র। রায়ে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড আর ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে?

তাই এখন চাইলেও আগের মতো ছেঁড়া যায় না মাকড়সার জাল। ফাঁদের গিট্টুতে ধরা পড়লে যে ওজন লাগে জাল ছিঁড়তে, তা সংখ্যার হিসেবে খুবই কম এবং ওই দেড় কোটি মানুষের মধ্যে তা স্রেফ অগ্রাহ্য করার মতো। এবার উত্তরের সর্বশেষ অংশে তিনি কী বলেছেন দেখা যাক, ‘যাঁরা ব্যাংক ডাকাতি করেছেন, তাঁদের জন্য কি কোনো আইনকানুন আছে দেশে?

এমনকি যাঁরা বড় বড় ঋণখেলাপি, তাঁদের নাম খেলাপিদের তালিকাতেই আসে না।’ এ বক্তব্যের সঙ্গে আমার পুরোপুরি দ্বিমত রয়েছে । কেননা, যাঁরা তাঁর ভাষায় ব্যাংক ডাকাতি করে (যদিও ঢালাওভাবে সব ঋণখেলাপিদের ব্যাংক ডাকাত বলা যায় না কিংবা উচিতও নয়। কেননা, ঋণ নিয়ে পণ্য রপ্তানি করা কোনো এক ব্যবসায়ীর যদি গোডাউন পুড়ে যায় বা বন্যায় নষ্ট হয়ে যায়, আর তারপর তিনি যদি ইনস্যুরেন্স ক্লেইম করেও সঠিক সময়ে না পান, তবে ঋণখেলাপি হতে বাধ্য। এ রকম চিত্র কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়, হরহামেশাই দেখা যায়। তাই ঢালাওভাবে ঋণখেলাপিদের ব্যাংক ডাকাত বলা আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুচিত বলে মনে করি), তাঁদের বিচার করার জন্য যে দুদক, অর্থঋণ, ব্যাংক কোম্পানি, মানি লন্ডারিং, ফৌজদারি দেওয়ানি আইন কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সার্কুলার রয়েছে, তা একজন বিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে তিনি অবশ্যই অবগত। উল্টো বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবিতে ঋণখেলাপি হিসেবে নাম আসার পর ব্যাংকের পুরো ঋণ শোধ করে দিলেও সে নাম কাটাতে আরেক যুদ্ধে নামতে হয় সাবেক খেলাপিদের, এটাও তাঁর অজানা থাকার কথা নয়।

প্রথম আলোর প্রশ্নটি ছিল, আদালতের কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের দুর্নীতির বিষয়ে কিন্তু তিনি বললেন তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনার কথা, যা পড়লে কোনো পাঠকের আইন-আদালতের প্রতি বিতৃষ্ণা জাগতে পারে, অশ্রদ্ধা আসতে পারে, হারাতে পারে আস্থা।

ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক কারণে হতাশার মধ্যে থাকা নাগরিককে একমাত্র আইন-আদালতই পারে কিছুটা স্বস্তির পরশ দিতে। ন্যায়বিচার পাবে না, এ ধারণা পোক্ত হলে অসহায় ভুক্তভোগী আরও অসহায়বোধ করবে, উৎসাহিত হয়ে আইন অমান্যকারী দুষ্কৃতকারী, দুর্নীতিবাজেরা দ্বিগুণ, তিন গুণ বা বহুগুণ হারে ঝাঁপিয়ে পড়বে দুর্নীতি করতে। আমরা নিশ্চিতভাবে কেউই চাই না, এ রকম একটি সমাজ যেখানে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু বিচার চাইবে না, খুনের শিকার পরিবার খুনের বিচার চাইবে না, দুর্নীতিবাজেরা মহা আনন্দে লুটপাট করবে এবং সেই টাকা আবার চলে যাবে অস্ত্রধারী ডাকাতের কাছে, ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে সবাই হাওয়া হয়ে যাবে, ইচ্ছেমতো গাড়ি চালিয়ে পিষে মেরে প্রতিদিন চলে যাবে বাস–ট্রাক–গাড়ি। কেননা, গাড়ি যাঁরা চালান, তাঁদের দরকার হয় না লাইসেন্স! মিলমালিকেরা মাসের পর মাস বেতন বকেয়া রাখবেন, শ্রমিকেরা টাকা চাইলে দেবেন মার। তাঁদেরও কিছুই করার নেই, কারণ সহজ—যে পরিমাণ ঘুষ দিতে হয় মিল চালাতে, তা দিয়ে নিজের সংসার টেকানোই দায়।

রাস্তার ধারে বখাটেরা ইচ্ছেমতো মেয়েদের ইভ টিজিং করবে আর আদালতের দেয়ালে ঝুলবে আইনের দাঁড়িপাল্লা, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে তা দেখবে সাধারণ নাগরিক। আমরা সবাই চাই, আদালতের বিভিন্ন স্তরের দুর্নীতি বন্ধ হোক। বন্ধ হোক কর্মকর্তা–কর্মচারীদের দৌরাত্ম্য, অন্যায় দাবি। আমরা চাই, মামলার পক্ষগণের হয়রানি বন্ধ হোক। তদবির নয়, আইনের চর্চা হোক আদালতে। অনেক হতাশার মধ্যে আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকা আদালতকে অবজ্ঞাভরে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে কি?

  • এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments