Homeসাক্ষাতকারআইনপেশায় নারীদের প্রতিবন্ধকতা ও উত্তোরণের পথ

আইনপেশায় নারীদের প্রতিবন্ধকতা ও উত্তোরণের পথ

আইনপেশায় নারীদের প্রতিবন্ধকতা অনেকগুলো আছে এবং এটা শুধু আইন পেশা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না। শুধু আইনপেশা নয় যেকোনো সেক্টরেই তাকান, নারীদের প্রতিবন্ধকতা প্রচুর। এগুলোর মূল কারণটা হচ্ছে এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। যেটার কারণে যে ধরনের সাপোর্ট একজন পুরুষ পেয়ে থাকে, সে পরিবারের থেকে বা সমাজের থেকে, সে ধরনের সাপোর্ট কিন্তু কখনোই নারীরা পায় না।

নারীদের থেকে যে একসেপ্টেশনগুলো, সামাজিকভাবে বা পারিবারিক ক্ষেত্রে, সেই একসেপ্টেশনগুলো একেবারে মানে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। যে রকম ঘর-সংসার দেখার দায়িত্ব, বাচ্চা-কাচ্চা বড় করার দায়িত্ব, তারপরে ফ্যামিলির যে মুরব্বিরা আছে, সেটা শ্বশুর-শাশুড়ি বলেন, বাবা-মা বলেন, তাদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব, পুরোটাই কিন্তু ডিসপ্রোপোরশনেট বার্ডেনটা পড়ে একজন নারীর ওপরে। সেটা কিন্তু পুরুষদের ওপর পড়ে না। তাদের যতভাবে সহায়তা করা যায়, পরিবার থেকেও সেই সহায়তাটা পায়, সমাজ থেকেও পায়। যে কারণে তারা কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কর্মক্ষেত্রে আমরা দেখছি যে নারীরা পিছিয়ে আছে এখন। যেটার জন্য সব ক্ষেত্রেই নারীরা যতদূর এগোনোর কথা আগাতে পারছে না। কিন্তু আমরা যদি স্পেসিফিক্যাললি আইন পেশাটা দেখি, এখানে প্রথমত আমাদের কোর্টগুলো যে আছে, শুধু সুপ্রিম কোর্ট না, প্রত্যেকটা লেভেলের কোর্ট, সেই পরিবেশগুলো কিন্তু নারীবান্ধব না। 

প্রথমত হচ্ছে ফ্যাসিলিটিজ। বেসিক যে ফ্যাসিলিটিগুলো, যে রকম টয়লেট ফ্যাসিলিটিজ, পর্যাপ্ত সংখ্যক টয়লেট নেই। এখন নেই। এখন যা আছে, আগে তো তাও ছিল না, কিন্তু এখনো নেই। তারপরে হচ্ছে ধরেন ডে-কেয়ার সেন্টার। যারা নতুন মা, তারা যদি কাজে ফেরত আসতে চায়, তাহলে

কিন্তু কিছু ঘটনা তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু সে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপও ঠিকমতো ঘটনাটা ঘটছে তাদের পরিবারও সাপোর্ট নেওয়া হয় না। আর হয়তো যাদের সাথে এই করে না। কারণ সাপোর্ট করবে কীভাবে? এটা যদি নিয়ে কেউ আওয়াজ তোলে, তাকেই দোষারোপ করা হবে। আমার সাথে নিশ্চয়ই তুমি কিছু করেছ। একটা নারীবান্ধব তো হয়নি, তোমার সাথে হলো কেন? পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই তখন কিন্তু এই আইন পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। এমন না যে দক্ষ মেধাবী নারী নেই, প্রচুর আছে। কিন্তু আমরা দেখছি যে ল প্র্যাকটিস না করে, কোর্টে না এসে তারা বিভিন্ন কর্পোরেট জবস এ চলে যাচ্ছে, কারণ সেখানে পরিবেশটা বেটার। 

আরেকটা হচ্ছে যে এই যে আওয়ার্সগুলো আমরা মেইনটেইন করি, কর্মঘণ্টা, এগুলো তো সম্ভব হয়ে ওঠে না বেশিরভাগ নারীর জন্যই, কারণ তাদের উপরে থাকে। সো মেবি ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক অপশনস পরিবারের অনেক দায়িত্ব আমাদের এক্সপ্লোর করতে হবে। যে কাজগুলো অনলাইনে করা যায়, সেই কাজগুলো তারা বাসার থেকেই অনলাইন শেষ করতে পারে। যেগুলোর জন্য ফিজিক্যাল প্রয়োজন থাকা, সেগুলো সো এই যে হাইব্রিড সিস্টেম, ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক অপশন, কিছুদূর রিমোট, কিছুদূর সশরীরে এসে কাজ করা।

তাদের জন্য কিন্তু বাচ্চাটাকে যদি সেখানেই রাখার একটা ব্যবস্থা থাকে, তারা কিন্তু আরও তাড়াতাড়ি কাজে ফেরত আসবে, গ্যাপটা কম হবে। ডে-কেয়ার সেন্টার যে রকম আমাদের সুপ্রিম কোর্টে আছে, কিন্তু বেশিরভাগ কোর্টগুলোতে কিন্তু এখনো নেই। আর সুপ্রিম কোর্টেও যেটা আছে, এটাও আরো ফ্যাসিলিটিজ বাড়াতে হবে। সংখ্যায় বাড়াতে হবে যারা কেয়ারগিভার্স তাদের। তারপরে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার। যে আমাদের প্রিয় অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান যে মামলাগুলো করলো, মামলা করে যে ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণারগুলো এস্টাবলিশ করা হলো বিভিন্ন জায়গায়, এটা কিন্তু এটাও কিন্তু এত বছর ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ না। এটা একটা রিসেন্ট, কিছু বছর হয়েছে এই ফেনোমেননটা। এগুলো হচ্ছে ফ্যামিলিটি ওয়াইজ । তারপরে হচ্ছে নারী নিরাপত্তা আর একটা ইস্যু। 

যৌন হয়রানি এমন একটা জিনিস, যেটা কিন্তু প্রত্যেকটা কর্মক্ষেত্রে দেখতে পারছি, যে কারণে অনেকে এগিয়ে আসতে চায় না। অনেক শোনা যায় এ ধরনের অ্যালিগেশনস। এগুলো শোনা যায় বললে সঠিক হবে না শুধু, এগুলো হচ্ছেও। ডে ইন ডে আউট হচ্ছে। যে যারা একটু পাওয়ারফুল পজিশনে আছে, তাদের হাতেই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে জুনিয়র মেয়েরা এবং তারা যেটা হচ্ছে যে, সমাজ তো তাদেরকেই দোষারোপ করবে, তারা যদি আওয়াজ তোলে। সে কারণে কিন্তু বেশিরভাগ ঘটনা আমি বা আপনি জানিও না।

এগুলো কিন্তু আমাদের ল’ ফার্মগুলো ইন্ট্রোডিউস করতে পারে। এটাতে করে হবে কী, আমরা ট্যালেন্ট রিটেইন করতে পারবো, বিশেষ করে নারী ট্যালেন্ট। নারী ট্যালেন্ট। এ রকম অনেকগুলো কারণ আছে। একটু একটু করে যে ইম্প্রুভ করছে না তা না, ইম্প্রুভ করছে। কিন্তু আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে হবে। অনেক মেধাবী জুনিয়র, মানে নারী আইনজীবী আমার জুনিয়র ছিল, যাদের আমি হারিয়েছি। হারানোর মূল কারণটা ছিল যে, বাসায় কাজের লোক নেই। তো কাজের লোক না থাকলে বাসার কাজগুলো তো আমারই করতে হবে। আমি দেখিনি এরকম কোনো সিচুয়েশন যে বাসার কাজের লোক নেই তো স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলেই বাসার কাজ একসাথে করছে। 

কারণ প্র্যাকটিস এমন একটা জিনিস, যে আপনি পাঁচ বছর প্র্যাকটিসের বাইরে থাকলে আপনি যে ক্লায়েন্টগুলো এতদিন বিল্ড করেছেন ক্লায়েন্ট বেইজটা, তারা তো চলে যাবে অন্য আইনজীবীদের কাছে। তারা তো আর আপনার জন্য বসে থাকবে না।

এই নানা কারণের জন্য কিন্তু নারী আইনজীবীরা শুরু করে ঠিকই, কিন্তু টিকে থাকতে পারে না। কারণ সেই কর্মঘণ্টা তারা মেইনটেইন করতে পারে না, পারিবারিক কারণের জন্য লম্বা ব্রেক নিতে হয়। বায়োলজিক্যাল কারণের জন্য যে বাচ্চা হবে,

দায়িত্বটা বেশিরভাগই মেয়েটার উপরে পড়ে যায়। বা আমার বাচ্চা হবে, তখন একটা বড় লম্বা ব্রেক নেয়। কয়েক বছর, পাঁচ বছর, ছ’বছরের ব্রেক যদি হয়ে থাকে, খুব ডিফিকাল্ট হয় তারপরে প্র্যাকটিসে  ফেরত আসা।

তারপরে বাচ্চাকে দেখার কেউ নেই তিন-চার বছর। তাদের অনেক ব্রেক নিতে হয় প্রফেশন থেকে। এই কারণগুলোর জন্য কিন্তু তারা ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং অনেকে দেখা যাচ্ছে ওই যে কর্পোরেট জবস নিয়ে নিচ্ছে। ফিনান্সিয়াল সিকিউরিটি আরেকটা ইস্যু। ফ্যামিলিতে সময় না দিয়ে বাইরে চাকরি করছি কিন্তু এখানে খুব একটা টাকা পয়সাও কামাচ্ছি না। বিশেষ করে প্রথম জীবনে তো যারা আইন পেশায় আছে তাদের ইনকাম তো খুবই লো থাকে। তখন জুনিয়ররা ভাবে তাহলে কোনো দরকার নেই, আমি কর্পোরেট চাকরি একটা নিয়ে নেই, ওখানে আমার ইনকামও ভালো হবে। এই অনেকগুলো কারণ আছে আসলে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণ পেতে হলে আদালতের পরিবেশটা নারীবান্ধব করতে হবে। নারীদের যে যে ফ্যাসিলিটিজ দরকার সেগুলোতে ইনভেস্ট করতে হবে। ডে-কেয়ার সেন্টারটাকে আরও বড় করতে হবে যাতে অনেক নারীরা তাদের নবজাতক যে বাচ্চারা আছে তাদের রেখে কাজ করতে পারে। টয়লেট ফ্যাসিলিটিজ বেটার করতে হবে। প্রত্যেকটা জায়গায় হাইজেনিক টয়লেট ফ্যাসিলিটিজ ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের এখন প্রত্যেকটা কর্মক্ষেত্রকে রিডিজাইন করতে হবে নারী এবং পুরুষ উভয়কে মাথায় রেখে। এটা শুধু পুরুষদের রাজত্ব না এখানে। তা আমাদের সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন সহজেই করতে পারে,

সদিচ্ছাটা যদি থাকে। এটাকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ এমন না যে ট্যালেন্ট নেই। প্রচুর মেধাবী নারী আইনজীবী আছে, তারা প্র্যাকটিস ছেড়ে চাকরিতে চলে যাচ্ছে বা টিচিংয়ে চলে যাচ্ছে এই পরিবেশের কারণে। সো সবারই করণীয় আছে। বার কাউন্সিলের যে রকম আছে, বিশেষ করে তো সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের আছে, এই পরিবেশটা সৃষ্টি করা। তারপরে একটা কমপ্লেইনস কমিটি ফর্ম করা উচিত, যৌন হয়রানির যে অভিযোগগুলো আমরা শুনতে পারি। যদি কমিটি থেকে থাকে সেটাকে অ্যাক্টিভিট করা, আর না থাকলে নতুন কমিটিগুলো গঠন করা। কারণ এ ব্যাপারে তো একটা রায়ও আছে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের কমিটি থাকতে হবে। এটাও তো একটা কর্মক্ষেত্র। করে প্রত্যেকটা আইন পেশায় এগিয়ে আসার

জন্য, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কথাটা বলি, যে এখানে কোনো শর্টকাট নেই। ইদানীং দেখি জুনিয়র ল’ ইয়ার্সরা খালি শর্টকাট খোঁজে। দু’বছরেই চেম্বার খুলে দেব, তিন বছরেই চেম্বার খুলে দেব। তারপরে দেখা যাচ্ছে যে ওরা ওই যে শেখার যে বিষয়টা, বা এক্সপেরিয়েন্স অর্জন করার যে বিষয়টা, সেটা ছাড়াই চেম্বার খুলে দিচ্ছে। আমি বলব কোনো শর্টকাট নেই। শর্টকাটের খোঁজে যারা এ পেশায় এসেছে, তাদের জন্য এ পেশাটা স্যুইটেবল না। এখানে অক্লান্ত পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। দিন রাত এক করে কাজ করে যেতে হবে। প্রথম দশ বছর ফোকাসটা ইনকামের উপরে ফোকাসটা হবে না, হতে হবে কাজ শেখার উপরে। যারা এটা করতে পারবে না।

তাদেরই এ পেশায় আসা উচিত। নারীদের ক্ষেত্রে আরেকটা জিনিস বলব, নারীরা সেটার কৃতিত্ব বা ক্রেডিট নেওয়ার আগে নিজেরা যে ভালো ভালো কাজগুলো করছে, দশবার চিন্তা করে। এবং নিজেদের ভালো যদি আমার ভালো কাজ প্রচার না করি কেউ কাজটা যে প্রচার করতে হবে, কারণ আমি জানবে যে আমি কাজ করতে পারি? না এদিকে নারীদের তাকাতে হবে। তারপরে জানলে তো আমার ক্লায়েন্টসও আসবে না। ধরেন ক্লায়েন্টের থেকে ফিস নেয়ার ব্যাপারে নারীরা লজ্জা পায়। সেখানে লজ্জা থাকলে হবে না। আমি যেই পন্থাটা নিজে সবসময় ব্যবহার করেছি, যে কোনো ক্লায়েন্টকে চার্জ করার আগে আমি দশটা ফার্মের সাথে বা পাঁচটা ফার্ম বা লইয়ার্সদের সাথে কথা বলতাম যে তোমরা এ কাজটার জন্য কী চার্জ করছো। সেখান থেকে কিন্তু আপনারা একটা ধারণা পাবেন যে এখন মার্কেটে কোনটা চলছে, মোটামুটি একটা ধারণা। সেই ভিত্তিতে ওই একই কোয়ালিটির কাজের জন্য আমি ওরকম চার্জ করতাম এবং নেগোশিয়েট করে ফিসটা নিতাম। এ ব্যাপারে হেজিটেট করলে হবে না যে আমার লজ্জা লাগে ফিস চাইতে। লজ্জা লাগলে এ পেশায় আসা উচিত

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম

সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments