Homeআপিল বিভাগরাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করল না সর্বোচ্চ আদালত; পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায় আপিল...

রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করল না সর্বোচ্চ আদালত; পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে বহাল

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তসহ সংবিধানের ৫৪টি অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। যেখানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের খোলনলচে পাল্টে ফেলা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়। ওই রিটের রায়ে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, গণভোটের বিধানসহ পাঁচটি অনুচ্ছেদের ওপর সিদ্ধান্ত দেয় হাইকোর্ট। বাকি ৪৯টি অনুচ্ছেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কি হবে তা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। হাইকোর্টের দেওয়া এই রায় বহাল রেখেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল চেয়ে দাখিল করা সকল আপিল খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। দাখিলকৃত এসব আপিলে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু আপিলকারীদের আবেদনে সাড়া দেয়নি আদালত। ফলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল তা বহাল রেখেছেন প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ।

আইনজ্ঞরা বলছেন, আপিল বিভাগের এ রায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। অতীতে অনেক রাজনৈতিক বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছে। সেই ধারা থেকে বের হয়ে আসল সর্বোচ্চ আদালত।

দুই বছর আগে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের উপর রায় দেয়। সে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল অবৈধ ঘোষনাসহ ৫টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। বাকি ৪৯টি অনুচ্ছেদের পরিবর্তনের বিষয়টি জাতীয় সংসদের হাতে ছেড়ে দেয়। হাইকোর্ট বলেন, এসব অনুচ্ছেদ পরিবর্তন, পরিমার্জন ও বিলোপের বিষয়ে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিরা। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। 

পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ পেলে অন্তবর্তি সরকারের আমলে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চেয়ে আপিল করে রিটকারী পক্ষ। আপিল করে জামায়াতে ইসলামীও। আপিল করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসহনামে একটি সংগঠনও।

তিন কার্যদিবস ওই আপিলের উপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে। শুনানিতে সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের কৌসুলি ড. এম শরীফ ভুঁইয়া বলেন, একটা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের চরিত্রকে বদলে ফেলা হয়েছে। সেজন্য সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল ও সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ সংরক্ষণ করে পুরো সংশোধনী বাতিল চেয়েছি। 

রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীতে যে সব অনুচ্ছেদে সংশোধন করা হয়েছে সেসব সংশোধনী যদি সুপ্রিম কোর্টের কোন রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে আপিল বিভাগ তা বাতিল করতে পারে। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণার জন্য কাল বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন। রায়ের পর জানা যাবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে তা বহাল রইল কিনা?

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে। এই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাতিল করা হয় নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারই বাতিল করেনি, সংবিধানের ৫৪টি অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হয় এই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ সরকার ভোটারবিহীন তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। যে নির্বাচন দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় সেই সরকারের। এরপর পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট দায়ের করা হয়। প্রথম রিটটি করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ ব্যক্তি। মো. মোফাজ্জল হোসেন নামের এক মুক্তিযোদ্ধা আরেকটি রিট করেন। এই রিটের দীর্ঘ শুনানিতে রিটকারী পক্ষ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা অংশ নেন। দুটি রিটের ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে রুল আংশিক মঞ্জুর করে গত ১৭ ডিসেম্বর রায় দেয় হাইকোর্ট।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, সংবিধানের ৫৮(খ) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে আনীত পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তথা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। যেহেতু মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, সেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সংবিধান পরিপন্থি ঘোষণা করা হলো।

গণভোটের বিধান পুনর্বহালের রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান বাতিল করায় সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ অসংশোধনযোগ্য করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জনমত বা জন আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অসংগতিপূর্ণ। ফলে পঞ্চদশ সংশোধনীর ১৪ নম্বর আইনের ৪২ ধারার মাধ্যমে যে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল তা অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হলো।

রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭(ক) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে বলা হয়েছিল সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণের অপরাধ হবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। ৭ (খ)তে বলা হয়, সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদসহ বেশ কিছু অনুচ্ছেদকে পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য ঘোষণা করা হলো। ৭(ক) (খ) অনুচ্ছেদকে বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট রায়ে বলেছে, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু ৭(ক) (খ) অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা এবং চিন্তার স্বাধীনতা, অভিব্যক্তিকে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দেয় এই আইন। কিন্তু ৭(ক) ও (খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে সেই নিশ্চয়তাকে খর্ব করা হয়েছে। এটা সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং চরম সংবিধানবিরোধী। তাই ৭(ক) (খ) অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো এবং এখন থেকে ধরে নিতে হবে যে, এর অস্তিত্ব কখনো সংবিধানে ছিলই না।

রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের রক্ষক হলো হাইকোর্ট। কিন্তু সংবিধানের ৪৪ (২) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে হাইকোর্টের জুডিশিয়াল রিভিউর ক্ষমতা সংবিধিবদ্ধ আদালতকে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আইন সভা। যা সংবিধানের ৪৪ (১) ও ১০২(১) অনুচ্ছেদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সাংঘর্ষিক। সেজন্য ৪৪ (২) অনুচ্ছেদকে বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা করা হলো।

যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি হাইকোর্ট

পঞ্চদশ সংশোধনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। পুনর্বহাল করা হয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংযোজন করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। এছাড়াও ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণাসহ মোট ৪৯টি অনুচ্ছেদে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে সেসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি হাইকোর্ট। এগুলো পরবর্তী জাতীয় সংসদের হাতে সিদ্ধান্ত নিতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী এখন এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments