বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক স্পীকার ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ১২ জুলাই ২০২৬ (রবিবার) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে ৯৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
জমির উদ্দিন সরকার (১ ডিসেম্বর ১৯৩১-১২ জুলাই ২০২৬) বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ ও প্রথিতযশা আইনজীবী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই স্থায়ী কমিটির সদস্য। তিনি ১৯৯০ সালে পঞ্চগড়ে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন।
জমির উদ্দিন সরকার ১ ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স একজন জোতদার ছিলেন। জমির উদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ অনার্স, এমএ ও পরবর্তীকালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাশ করেন। পরে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-এট-ল সনদ লাভ করেন।
তিনি এক কন্যা ও দুই পুত্রের জনক। তার ছেলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নওশাদ জমির ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। তিনি নূর আখতারকে বিয়ে করেন, যিনি ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই দম্পতির এক কন্যা, নিলুফার জমির এবং দুই পুত্র, নওশাদ জমির এবং নওফেল জমির।
জমির উদ্দিন সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট থেকে সনদ নিয়ে ২৭ মে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগদান করেন। তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন বিশেষজ্ঞ।
জমির উদ্দিন সরকার ১৯৪৫ সালে ছাত্র থাকা অবস্থায় তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। পরে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের সমর্থক ছিলেন।
তিনি আওয়ামী মুসলিমের লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও মাওলানা ভাসানীর সহচর।
আইন পেশায় সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তাকে পাঁচবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান। দল গঠনের প্রথম পর্যায়ে জিয়াউর রহমান জাগদল গঠন করলে তিনি তাতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদলের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য। পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য হন।
১৯৭১ সালে হাইকোর্টে আইনজীবীদের যে গ্রুপটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, জমির উদ্দিন সরকার তাদের একজন।
জমিরউদ্দিন সরকার বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ২১ জুন ২০০২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ সাল পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জমিরউদ্দিন সরকার জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় ৬ এপ্রিল ১৯৮১ থেকে ২৭ নভেম্বর ১৯৮১ সাল পর্যন্ত গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বর্তমান সংসদ ভবনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন। আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় তিনি ২৭ নভেম্বর ১৯৮১ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পঞ্চম জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার প্রথম মন্ত্রীসভায় ২০ মার্চ ১৯৯১ থেকে ২৮ আগস্ট ১৯৯১ পর্যন্ত ভূমিপ্রতিমন্ত্রী ও ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ থেকে ১৯ মার্চ ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে গঠিত স্বল্পকালীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রীসভায় তিনি ১৯ মার্চ ১৯৯৬ থেকে ৩০ মার্চ ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
জমির উদ্দিন সরকার অষ্টম জাতীয় সংসদে ২৮ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জমির উদ্দিন সরকার ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন দিনাজপুর-১ আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনি ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ, ১২ জুন ১৯৯৬ সালের সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
নবম জাতীয় সংসদের বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে ২০০৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।[
প্রকাশিত বই
- গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
- এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান
- লন্ডনে শিক্ষা জীবন
- স্ট্রংগার ইউনাইটেড ন্যাশনস ফর পিসফুল ওয়েলফেয়ার ওয়াল্ড
- পাল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন
- গ্লিমপেসেস অব ইন্টারন্যাশনাল ল
- অষ্টম সংসদে স্পীকার
- দি ল অব দি সি
- ল অব দি ইন্টান্যাশনাল রিভারস এ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্রস
- লন্ডনে বন্ধু-বান্ধব
- লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন
- বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি

