Homeঅধস্তন আদালতশারীরিক সম্পর্কে রাজি না হওয়ায় কিশোরীকে গলা কেটে হত্যা

শারীরিক সম্পর্কে রাজি না হওয়ায় কিশোরীকে গলা কেটে হত্যা

২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে খুন জুবা আক্তার নামে এক কিশোরী। পিতার বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে রাজি না হওয়ায় নির্মমভাবে তাকে খুন করেন গোলাম হোসেন ও খলিল উদ্দিন। খুনের আগে ধর্ষেনর শিকার হন ওই কিশোরী। খুনের সেই মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন খলিল। যিনি পেশায় একজন ড্রাইভার। আছে স্ত্রী-সন্তানও। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া তার জবানবন্দি তুলে ধরা হলো পাঠকের জন্য….

“আমি পেশায় একজন ড্রাইভার। আমি বিবাহিত এবং আমার ১টি পুত্র সন্তান আছে। হরিনগর সাকিনস্থ গোলাম হোসেন গ্রাম সম্পর্কে আমার দাদা হয়। গোলাম হোসেন এর চায়ের দোকানে আমি বেশির ভাগ সময়ই রাতের বেলা আডডা দিতাম। তার বাড়ি ও আমার বাড়ি পাশাপাশি। তার বাড়ির সামনেই চায়ের দোকান। সে বিভিন্ন মেয়েদের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলত। ভিকটিম জুবা আক্তার এর সাথেও তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয়। সে ভিকটিমকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে ভিকটিম তাতে রাজি হয়নি মর্মে সে আমাকে বলে। গোলাম হোসেন আমাকে ভিকটিম এর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বর দিলে আমি ভিকটিমকে কল দেই। তার সাথে কিছুদিন কথা বলার পর আমরা দেখা করি। এরপর এক পর্যায়ে তার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তার সাথে আমার সম্পর্ক হয়েছিল। সে আমার স্ত্রী-পুত্রের বিষয়ে কিছুই জানে না। পরে ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে রাত অনুমান ০১.০০ ঘটিকায় বাগাউড়া সাকিনন্ত ভিকটিম এর বাড়ীর উত্তর দিকে রাস্তার পাশের ধানী জমিতে ভিকটিম এর সাথে আমার শারীরিক সম্পর্ক হয়। ভিকটিম সম্পর্কের শুরুতে আমাকে তার নাম রিমা বলেছিল। আমি তাকে রিমা বলে ডাকতাম। কিছুদিন পর (সম্পর্কের পর) আমি ভিকটিমকে তার ব্যবহৃত ফোন নম্বরে বার বার কল দিয়ে ওয়েটিং পেয়ে বুঝতে পারি সে অন্য কারো সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলত। ভিকটিমকে দীর্ঘ সময় কার সাথে কথা

বলে তা জিজ্ঞেস করলে ভিকটিম আমাকে মিথ্যা কথা বলে। তখন ভিকটিমের উপর আমার খুব রাগ হয়। পরে সে অন্য কারো সাথে কথা না বলার প্রতিশ্রুতি দিলে আমরা পূর্বের মতই কথা বলতে শুরু করি। আমার স্ত্রী তখন আমার শ্বশুর বাড়ীতে ছিল। এই কারনে ভিকটিমের সাথে আমি দীর্ঘসময় কথা বলতে পারতাম। 

গোলাম হোসেন আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে সব কিছু জানতো। ভিকটিমের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়েও আমি গেলাম হোসেনকে বলেছিলাম। সে আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে জানতে পেরে ভিকটিমের সাথে তাকে দেখা করিয়ে দিতে বলে। গত ২৬/১২/২০২১ খ্রি তারিখে দুপুর বেলায় ভিকটিমের সাথে মোবাইলের মেসেজ এর মাধ্যমে কথোপকথন হয়। সেদিন দিনের বেলায় মেসেজ আদান প্রদানের মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ হয়। তখন জানতে পারি, সে তার পুরনো রুপার চেইন বিক্রি করে দিতে চায়। আমি ২০০০/- টাকার বিনিময়ে চেইনটি খরিদ করবো মর্মে জানালে সে তাতে রাজি হয়। ভিকটিম তার চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে বলে আমাকে জানায়। 

পরে তাকে টাকা দেয়ার জন্য রাত ০১.০০ ঘটিকায় তার বাড়ীর পাশে যাবার সিদ্ধান্ত হয়। সেদিন সন্ধ্যা বেলা আমি গোলাম হোসেনের দোকানে গিয়ে রাত ০১.০০ ঘটিকায় ভিকটিম এর সাথে দেখা করার বিষয়ে জানাই। এরপর আমি বাড়ীতে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে রাত অনুমান ১২.০০ ঘটিকার সময় গোলাম হোসেন এর দোকানে যাই। সে প্রায়ই অনেক রাত পর্যন্ত দোকানের ভিতরে থাকে। তারপর আমি গোলাম হোসেনকে নিয়ে বাগাউড়া সাকিনন্ত ভিকটিমের বাড়ীর উত্তর দিকে রাস্তার পাশে ধানী জমিতে গত ২৬/১২/২১খ্রিঃ দিবাগত রাত অনুমান ০১.০০ ঘটিকা হতে ০১.৩০ ঘটিকার মধ্যে পৌঁছাই। হরিনগর সাকিন ও বাগাউড়া সাকিন পাশাপাশি। আমরা দুজন হেঁটেই ঘটনাস্থলে যাই। এরপর ভিকটিমকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে মেসেজ দিয়ে তাকে ঘটনাস্থলে আসতে বলি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিকটিম ঘটনাস্থলে চলে আসে। ঐ সময় গোলাম হোসেন গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। ঘটনাস্থলে ভিকটিমের সাথে আমার শারীরিক সম্পর্ক হয় তখন গোলাম হোসেনকে ভিকটিম দেখতে পায়নি। আমিও তাকে গোলাম হোসেনের উপস্থিতির বিষয়ে কিছুই জানাইনি। আমাদের শারীরিক সম্পর্কের পরে গোলাম হোসেন আড়াল হতে বের হয়ে আসলে ভিকটিম তাকে চিনতে পারে। ভিকটিম তাকে দেখে খুব অবাক হয়ে যায়।

গোলাম হোসেন ভিকটিমের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য ভিকটমকে হাত ধরে টান দেয়। ভিকটিম গোলাম হোসেনের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে রাজি না হলে গোলাম হোসেন তাকে জোর করে। গোলাম হোসেন আমাকে বলে ভিকটিমকে রাজি করাতে। তা না হলে সে আমাদের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে সবাইকে বলে দিবে মর্মে হুমকি দেয়। তখন আমি ভিকটিমকে তার সাথে সম্পর্ক করার জন্য বিভিন্ন ভাবে বুঝিয়ে বলি। ভিকটিম জানায় যে সে তার পিতার বয়সী লোকের সাথে মরে গেলেও শারীরিক সম্পর্ক করবে না। 

সে কোন ভাবেই রাজী না হলে গোলাম হোসেন রেগে গিয়ে আমাকে ভিকটিমের মুখে চেপে ধরতে বলে। গোলাম হোসেন প্রথম থেকেই ভিকটিমের হাত জোর করে ধরে রেখেছিল। আমি তখন ভিকটিমের মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরলে গোলাম হোসেন ভিকটিম এর পরনের ওড়না দিয়ে তার দুই হাত বেঁধে ফেলে। ওড়নার মাঝামাঝি স্থানে দুই হাত রেখে একটি গিট দিয়ে হাতের কবজিদ্বয় বরাবর বাঁধে। তারপর ওড়নার একপ্রান্ত ভিকটিমের ঘাড় দিয়ে পেঁচিয়ে গলার সামনে দিয়ে টেনে ধরে আসামী গোলাম হোসেন। আমি তখন ভিকটিমের মুখ হতে হাত সরিয়ে ওড়নার অপর প্রান্ত বিপরীত দিকে ভিকটিম-এর ঘাড় দিয়ে পেঁচিয়ে গলার সামনে দিয়ে টেনে ধরি। 

আমি আর গোলাম হোসেন ভিকটিম-এর গলায় ওড়নার দুই প্রান্ত ক্রস করে দুই পাশ দিয়ে কিছুক্ষণ টেনে ধরে রাখি। ভিকটিমের হাত দুটি ক্রস করে বাঁধা অবস্থায় তার বুকের উপর ছিল। ভিকটিম ছটফট করতে থাকে। সে চিৎকার করতে পারেনি। এরপর ভিকটিম মাটিতে পড়ে যায় এবং তার পা ছুড়তে থাকে। গোলাম হোসেন ওড়না ছেড়ে দিলে আমি একাই ভিকটিমের গলায় ওড়নার দুই প্রান্ত দুই হাতে টেনে ধরে রাখি। 

ঐ সময় গোলাম হোসেন তার পরনের জ্যাকেটের পকেট হতে একটি ব্লেড বের করে ভিকটিমের গলায় ওড়না সরিয়ে গলায় সজোরে পৌঁচ দেয়। এরপর আমি ওড়না ছেড়ে দিয়ে তার গলায় একই ব্লেড দিয়ে একটি পোঁচ দেই। এরপর গোলাম হোসেন ঐ একই ব্লেড দিয়ে পুনরায় ভিকটিমের গলায় গোঁচ দেয়। এরপর ভিকটিমের গলা হতে ওড়না খুলে পুনরায় ভিকটিমের দুই হাত ক্রস করে কবজি বরাবর শক্ত করে বেঁধে ওড়নার ওপর প্রান্ত দিয়ে ভিকটিমের মুখ মাথার চারপাশ দিয়ে পেঁচিয়ে গোলাম হোসেন মাটিতে বসে।

ভিকটিম তার সাথে তার রুপার চেইনটি নিয়ে আসলেও পরে আমি তার চেইনটি নিয়ে আসিনি। ভিকটিম মারা গেছে বুঝতে পেরে আমরা ঘটনাস্থলেই তার লাশ ঐ অবস্থায় রেখে ধান ক্ষেত হয়ে বাড়ীতে চলে আসি। বাজারের রাস্তা দিয়ে গেলে পাহাড়াদার দেখে ফেলার ভয়ে ক্ষেতের ভিতর দিয়ে যে যার বাড়ীতে যাই। 

গোলাম হোসেন আমাকে বাড়ীতে গিয়ে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিতে বলে এবং অপরিচিত ব্যক্তির মতো কথা বলতে বলে। আমি বাড়ীতে যাবার রাস্তায়ই পরিকল্পনা অনুযায়ী গোলাম হোসেন এর মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিয়ে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করি। তখন সে আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করে আমি কোথা থেকে ফোন করেছি। আমি তখন তাকে আমি সিলেটে আছি বলে ফোন কেটে দিয়েছিলাম। এরপর তার সাথে আমার আর কোন যোগাযোগ হয়নি। 

ঘটনার তারিখ ২৬/১২/২০২১খ্রিঃ দিবাগত রাত অনুমান ০২.০০ ঘটিকা হতে ০২.৩০ ঘটিকার মধ্যে (তাং ২৭/১২/২০২১খ্রিঃ) বাড়ীতে পৌঁছাই। একই দিনে রাত অনুমান ০৩.০০ ঘটিকার সময় (তারিখ-২৭/১২/২১খ্রিঃ) ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বর হতে আমার মোবাইল ফোন নম্বরে দুইবার কল আসে। আমি কল দুটি রিসিভ করলেও কারো কথা শুনতে পাইনি। ভিকটিমের নম্বর হতে কে কল দিয়েছে তা বলতে পারব না। পরে সকাল বেলা অনুমান ১১.০০ ঘটিকার সময় তাং- ২৭/১২/২১খ্রিঃ ভিকটিমের লাশ পাওয়া যায় মর্মে শুনতে পেয়ে আমিও দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিকটিমের লাশ দেখতে পাই।

কিন্তু সেখানে গোলাম হোসেনকে দেখিনি। গতকাল দিবাগত রাতে ৩০/১২/২১খ্রিঃ আমার নিজ বসত বাড়ী হতে পুলিশ আমাকে আটক করে। অনুমান রাত ১২.৩০ ঘটিকায় গ্রেফতার করে। আমাকে গ্রেফতার করার পর পুলিশ গোলাম হোসেন-কে ও আটক করে। এই আমার জবানবন্দি।”

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments