জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহন শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের পর সাক্ষ্যগ্রহন শুরু হয়। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে সাক্ষী মো. সাকিব আহম্মেদ তুলন বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেই। রাজধানীর বাড্ডা পোস্ট অফিস রোড এবং ব্র্যাক ইউনিভারসিটির সামনে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। এই আন্দোলনে আমরা পুলিশের অনেক বাধার শিকার হই। পুলিশ ছাত্র জনতার উপরে ব্যাপক ভাবে টিয়ারশেল ও ছররা গুলি নিক্ষেপ করে। রাজপথে টিকতে না পেরে আমি বাসায় চলে যাই। পুলিশের ছররা গুলিতে ঐ দিন অনেকেই আহত হয়। মিডিয়াতে দেখেছি ব্র্যাক ইউনিভারসিটির সামনে পুলিশ একজন ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, পরদিন আমি, মারুফ, মারুফের মামা ফয়সাল ও রাজিব সহ আমরা ব্র্যাক ইউনিভারসিটির সামনে মিছিলে অংশগ্রহণ করি। ব্র্যাক ইউনিভারসিটির সামনে থাকা অবস্থায় দেখতে পাই রামপুরা ব্রীজের দিকে যারা যাচ্ছে তাদেরকেই পুলিশ ও বিজিবি গুলি করে মেরে ফেলছে। সেখানে আমি পাঁচ জনকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত অবস্থায় দেখেছি।
জবানবন্দিতে সাকিব বলেন, আমি, মারুফ, ফয়সাল ও রাজিব ব্র্যাক ইউনিভারসিটির সামনে থেকে রামপুরার ব্রীজের দিকে এগিয়ে যাই। আছর শেষে মাগরিবের নামাজের আগে রামপুরা ব্রীজের দিক থেকে আসা গুলির একটি প্রকট শব্দ শুনতে পাই। মারুফকে রাস্তার পাশে ফুটপাতের উপর পড়ে যেতে দেখি। প্রথমে মনে করি মারুফ ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে গেছে। পরে দেখি তার তলপেটে ডান পাশে গুলি লেগেছে। মারুফ আমাকে বলে “মামা আমার গুলি লেগেছে আমাকে বাঁচাও”। সে তখন অচেতন হয়ে যায়। আমরা অনেক কষ্ট করে একটি এ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করে তাকে এএনজেড হাসপাতাল নিয়ে যাই। এর মধ্যে মারুফের অনেক রক্তক্ষরন হচ্ছিলো। রক্ত থামানোর জন্য গুলিবিদ্ধ স্থানে আমি হাত দিয়ে চেপে ধরি। কিন্তু ক্ষত স্থানের রক্তক্ষরন থামানো যাচ্ছিলো না বিধায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। আমি, ফয়সালসহ কয়েকজন মিলে মারুফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে রামপুরা ব্রীজের কাছে আমরা বাধার সম্মুক্ষিন হই। পুলিশ ও বিজিবি আমাদের বাধা দেয়। সেখান আমাদের প্রায় আধা ঘন্টা সময় নষ্ট হয়। ততক্ষনে মারুফে অবস্থা প্রায় শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায়। একপর্যায়ে তারা আমাদের এ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দেয়। আমরা আবুল হোটেল ক্রস করে শান্তিনগর হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পথে শান্তিনগর ব্রীজে উঠার আগে মারুফ মারা যায়। মারুফ তখন আমার বাম হাতের উপরে ছিলো। তারপরও আমরা মারুফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইমার্জেন্সিতে গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে আছে, বহু আহত ব্যক্তি আসছে। কিছুক্ষন পর একজন ডাক্তার এসে মারুফকে পরীক্ষা করে বলে সে মারা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ মর্গে নিয়ে যায়। পোস্টমর্টেম করে লাশ নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে উপরের অর্ডার আছে আমরা একটা লাশও হাসপাতাল থেকে বের হতে দিবো না। তিনি বলেন, ২০ জুলাই সকাল ১১ টার দিকে আমি ব্র্যাক ইউনিভারসিটির দিকে যাই। সেখানে গুলির শব্দ শুনতে পাই। লোকজন বলাবলি করছিলো উত্তর বাড্ডা এএনজেডের সামনে একজন গুলি খায়। বাড্ডা পোস্ট অফিস রোডে একজন গুলি বিদ্ধ হয় এবং মেরুল বাড্ডায় একজন গুলি বিদ্ধ হয়। আমার শরীর খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি বাসায় চলে যাই।
তবে জবানবন্দি গ্রহন সমাপ্ত না হওয়ায় ২৯ জুন পর্যন্ত মুলতবি করে ট্রাইব্যুনাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যান্যরা। জবানবন্দি গ্রহন উপলক্ষ্যে সকালে কারাগার থেকে কামরুল ও মেননকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। গত ৩০ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
কামরুল-মেননের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহন শুরু: “মামা আমার গুলি লেগেছে বাঁচাও”
RELATED ARTICLES
Recent Comments
on Hello world!

