আলম খান, আইনজীবী, সুপ্রীম কোর্ট
একটি দেশের আদালত হল জীবনের রুহ। যা কেউ দেখে না কিন্তু তার মাধ্যমে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ঠিক আদালতো তাই।আমার প্রাক্টিস প্রায় ১৯ বছর এর মধ্যে প্রায় ১০ বছর সুপ্রিম কোর্টে।আবার রাষ্ট্রের উকিল হয়ে প্রায় ২ বছর।আমি আমার অবস্থান থেকে যা যা দেখেছি শুনেছি, বুঝেছি অতিত সম্পর্কে ধারনা পেয়েছি এবং ভবিষ্যৎতে যা করতে পারে তা তুলে ধরলাম।
পৃথিবীর প্রায় দেশের ভুমির মালিকানা রাষ্ট্রের এবং প্রায় দেশে ভুমি নিয়ে বিরোধ নেই।তাই ভুমি নিয়ে মারামারি নেই। ফৌজদারী মামলায় সংগঠিত হয় বাণিজ্যিক বিষয়াদি নিয়ে।তার স্বল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলাম।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম সিনিয়র এডভোকেট শিশির মনির সহ সবাই বলছে আপিল্যাট ডিভিশনে বিচারক দিয়ে কোর্ট বৃদ্ধি করে দ্রুত মামলা শেষ করা জরুরী প্রয়োজন। তাই আমার এই লেখা। স্বাধীনতার আগে এবং বর্তমান
১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় বর্তমানের মতো সুপ্রিম কোর্ট ছিল না, এর পরিবর্তে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে ফেডারেল কোর্ট অব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল যার প্রধান কার্যালয় ছিল করাচি।পুর্ব পাকিস্থানে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে বিচারক ও আইনজীবী সবই ধার করে গঠিত হয়। প্রায় এদেশের ছিল না। আদালতের ভাষা ইংরেজী কিন্তু আমাদের মাতৃভাষা বাংলা।এইদেশের সকল আইন ইংরেজীতে।২০২৩ সালে মাননীয় সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন স্যার বাংলার উপর গুরুত্ব দিয়ে অনেক গুলি আইন ও সর্বোচ্চ আদালতে রায় বাংলা করেছেন। কিন্তু এখন আবারও পুর্বের মতো মনে হয় ইংরেজীতে বললে অনেক জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ। আবার বার কাউন্সিল সনদ দেন এডভোকেট বা উকিল কিন্তু সুপ্রীম কোর্টে প্রায় নামের আগে ব্যারিষ্টার বাণিজ্যিক কোর্টে প্রায় সবই ব্যারিষ্টার। ব্যাংক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যাারিষ্টারদের বেশী মু্ল্যায়ন করেন।১৯৪৭ সালে আমাদের কে প্রদেশের মর্যাদা দেন ঠিকই কিন্তু প্রদেশ হতে যে সব প্রতিষ্ঠানের উন্নত হওয়ার দরকার ছিল তার প্রয়োজন মত ছিল না।আবার ভাষা ছিল ইংরেজী। মক্কেল লুঙ্গি পরা কৃষক মজুর শ্রমিক শ্রেনী আর উকিল ব্যারষ্টার কোর্ট ছিল আধুনিক চকচক আর ভাষা ছিল ইংরেজী। বর্তমানেও ইংরেজী বুঝে না ৯০% মানুষ। এত বড় শ্রেনীর মানুষকে বাদ দিয়ে কোন কিছুই ভাল হবে না এটাই স্বাভাবিক।
অনেক সিনিয়র কে বলতে শুনি মেধা শুন্য ও প্রশিক্ষন জরুরী। বর্তমান প্রায় ৮০ হাজার আইনজীবী। পরিক্ষার্থী আছে ৬৯ হাজার তাহলে ধরে নিতে পারি আগামী ১০ বছর পর ১ লক্ষ ৩০ হাজার আইনজীবী হবে।এবার আসি প্রস্তাবে।
১৯৪৭ সালে সুপ্রীম কোর্ট প্রতিষ্টিত হয়। ১৯৭১ সালে সুপ্রীম কোর্টের বিচারক ও আইনজীবী সঠিক ভাবে গড়ে উঠেনি। তার কারণ আইনজীবীদের বেশীর ভাগ ছিলেন এমপি, মন্ত্রী রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত কেউ আইন পেশা মনযোগ দেন নাই।বর্তমান সময়ে দেওয়ানী আদালত ভেঙ্গে ফিসক্যাল কোর্ট মানে বন্দর,কাস্টমস ভ্যাট, আয়কর, অর্থঋণ আদালত সহ আরো অনেক কোর্ট হয়েছে। আবার ফৌজদারী দণ্ডবিধি ভেঙ্গে নারী শিশু আদালত, মাদক দ্রব্য সহ অনেক ট্রাইবুনাল হয়েছে। আগে এত আদালত ছিল না। তাই বর্তমানে যা যা করতে হবে।
১। সুপ্রীম কোর্টের আপিল্যাট ডিভিশনে বিচারক হবেন ১২ জন আদালত হবে ৪ টি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতি ও হাইকোর্ট আইনজীবী সমিতি দুটি সংগঠন হবে। স্বাধীনতার পর সুপ্রিম কোর্ট গঠিত হলেও আইনজীবীদের সংখ্যায় কম ছিল বিধায় দুটি সংগঠন বা সমিতি না হয়ে একটি হয়েছে। বর্তমান ১৭ হাজার আইনজীবী সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে। তাই দুটি সমিতি হলে যারা হাইকোর্টে আছেন তাদের আগ্রহ বেড়ে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট আপিল্যাট ডিভিশনে ভাল ও মেধাবীরা প্রাক্টিসে আগ্রহী হবে।বর্তমান আপিল্যাট ডিভিশনে আইনজীবী ৭০০ জনের উপরে আমার জানা মতে।কোর্ট না থাকায় সবাই হাইকোর্টে প্রাক্টিস করছেন।
২। যারা জজ কোর্টে প্রাক্টিস করছেন তাদের আদালত দেওয়ানী, ট্রাইবুনাল, অর্থঋণ, ফৌজদারী আদালত মানে দন্ডবিধি ভেঙ্গে ৭ টি আদালত হয়েছে।তাদের আদালত ও আইনজীবীদের জ্ঞান অনেক তাই তাদের প্রশিক্ষনের প্রয়োজনীতা নাই বলে মনে করি। সেখানে আদালতের ভাষা এবং রায় আদেশ সব ক্ষেত্রেই বাংলা। তাদের কোন সমস্যা হয় না। তবে জনসংখ্যা অনুপাতে জেলা দায়রা জজ ভেঙ্গে মহানগরে ৪ টি করা জরুরী তাহলে মামলার জট থাকবে না। ১৯৭২ সালে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি বর্তমান প্রায় ২০ কোটি তাই কোর্টের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে হয়।
৩।আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ এবং বিচারকদের ও জনগনের চাহিদা অনুযায়ী আচার আচরণ নিয়ে প্রশিক্ষন জরুরী।
৪। সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী প্রায় ১৭ হাজার সেই তুলনায় আইনজীবীদের বসার জায়গায় অনেক কম।যা সুপ্রীম কোর্টের চাহিদা ভাল আইনজীবী কিন্তু ভাল আইনজীবী সৃষ্টির যে সব জিনিস প্রয়োজন তার মধ্যে বসে আরাম করে প্রক্টিস একটি জরুরী এটাই নেই।সুপ্রিম কোর্টের ভিতরে লাউন্স একটি। কোর্ট প্রায় ৮০ টি আদালত প্রতি কোর্টে ৫০ জন আইনজীবী হলে ৪ হাজার। একটি লাউন্সে হয় না, কমপক্ষে ৫ টি প্রয়োজন।
৫।মাননীয় বিচারক ও আইনজীবীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা থাকায় প্রয়োজন। কেউ আবেগে কোন কিছু করার সুযোগ খুবই কম।রাষ্ট্র সকল আইন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে করেছেন। তারপরও মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হলে জনগন সুপ্রীম কোর্টে রীট দায়ের করেন।মাননীয় বিচারক মৌলিক অধিকার সামান্যতম ক্ষুন্ন হলে ই আদেশ দেন।দেওয়ানী আদালতে অর্ডার, ১৫১ ধারার দরখাস্ত ওআদেশের বিরুদ্ধে এবং ফিসক্যাল কোর্টের এডজুডিকেশন অর্ডার এর বিরুদ্ধে আপিল সময় মতো করতে না পারলে তামাদি মেয়াদ শেষে কোন রিমিডি না থাকলে রীট করে থাকেন। ফৌজদারী আদালতে তামাদি হলে রিভিশন করে থাকেন, আপিল রিভিশন, ফৌজদারী কার্যবিধি ৫৬১ ধারা কোয়াশমেন্ট করে থাকেন। এইসব মামলা সঠিক সময় শুনানি হয় না। আবারও বলছি রাষ্ট্রের আইন এমন ভাবে করা কেউ অপরাধ করে ছাড় পাবে না।হাইকোর্টের একটি ফিসক্যাল সিনিয়র কোর্টে প্রায় ১৫ মাস ডিউটি করেছি রাষ্ট্রের পক্ষে।একদিন আদালত ডেস্কে ডেকে নিয়ে বলেছে এত কঠিন ভাবে বললে আইনজীবীদের কিভাবে রিমিডি দিব। বলেছি রাষ্ট্রের আইনকে ফাকি দেওয়ার সুযোগ নেই। আদালত বলল নিচের আদালতে ভুল করলে আদালত সেটার সুযোগ নিয়ে আদেশ দেওয়ার অধিকার আছে।আমাদের সবাইকে মানবিক হতে হবে। কেউ যেন সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ না করেন তার জন্য আমাদের সবাইকে দৃষ্টি দিয়ে সমাধানের পথ বের করতে হবে।অহংকার থাকা ভাল না।প্রশিক্ষন সবার প্রয়োজন ।
ভুল হলে ক্ষমা করবেন।

