১৬ বছর (২০০০ সালের ১ জুলাই) আগে সিটি কলেজের ছাত্রী রুশদানিয়া ইসলাম বুশরা ফুলকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে করা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এম এ কাদের এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া তাঁর স্ত্রী রুনু কাদের খালাস পেয়েছিলেন। অপর দুই আসামিকেও খালাস দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ফলে নিম্ন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত চারজনই খালাস পেয়েছিলেন।
আইনজীবীরা সেসময়ে বলেছিলেন, সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পর শেষ ধাপ ছিলো পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার সুযোগ। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছিল, রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে রিভিউর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা। এই রায়ে ন্যায়বিচার পাননি জানিয়ে বুশরার মা লায়লা ইসলাম বলেছিলেন, এখন মনে হয়, বুশরা বলতে কেউ জন্মগ্রহণই করেনি। বুশরা নামে কেউ ছিল না, কেউ খুনও হয়নি।
হাইকোর্টের রায়ে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বুশরার আত্মীয় এম এ কাদের ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত রুনু কাদেরের দণ্ড বহাল থাকে। কাদেরের শ্যালক শেখ শওকত আহমেদ ও শেখ কবির আহমেদ খালাস পান। নিম্ন আদালতের রায়ে এই দুজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।
দুজনকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছিল। অন্যদিকে দণ্ডাদেশ বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে কাদের ও রুনু কাদের (রুনা আক্তার) আপিল করেন। ২০১৬ সালের ১৫ই নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ ও দুজনের করা আপিল মঞ্জুর করে রায় দেন। সেসময়ে ওই দুজন আসামি কারাগারে ছিলেন বলে জানিয়েছিল তাঁদের কৌঁসুলি।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোন্দকার দিলীরুজ্জামান।
কেটে গেল ষোলোটি বছর: সিটি কলেজের মার্কেটিং বিভাগের সম্মান শ্রেণির ছাত্রী রুশদানিয়া ইসলাম বুশরা ২০০০ সালের ১ জুলাই রাতে ৩ নম্বর পশ্চিম হাজিপাড়ার বাসায় খুন হন। ওই ঘটনায় বুশরার মা লায়লা ইসলাম পরদিন রমনা থানায় মামলা করেন। পরে ওই বছরই আরেকটি সম্পূরক অভিযোগ দাখিল করেন বুশরার মা। এতে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাদের (বুশরার খালুর সৎভাই), কাদেরের স্ত্রী রুনু কাদের এবং কাদেরের শ্যালক মো. শওকত আহমেদ ও কবির আহমেদকে আসামি করা হয়। মামলায় ওই বছরের ১৯ ডিসেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এতে কাদেরের শ্যালিকা কানিজ ফাতেমা ও কাজের মেয়ে সুফিয়ার নাম আসে। মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২০০৩ সালের ৩০ জুন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রায় দেন। রায়ে কাদের, শওকত ও কবিরকে মৃত্যুদণ্ড এবং রুনু কাদেরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের করা আপিল এবং আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) ওপর হাইকোর্টে শুনানি হয়। ২০০৭ সালের ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে এম এ কাদের ও তাঁর স্ত্রী রুনু কাদেরের সাজা বহাল রাখা হয়। অপর দুজন (শওকত ও কবির) খালাস পান। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ এবং দণ্ডিত ব্যক্তিরা পৃথক আপিল করেন। এসব আবেদনের ওপর শুনানি শেষে গতকাল রায় ঘোষণা করেন সর্বোচ্চ আদালত।
দুই পক্ষের বক্তব্য: আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছিলেন, ‘এখানে পয়েন্ট অব ল ছিল। বাদীপক্ষের মামলা হলো কোনো দুর্বৃত্ত তার মেয়েকে গভীর রাতে ধর্ষণ করে খুন করেছে। এর কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী নেই। একজন বলেছে, এদের সঙ্গে তাদের শত্রুতা ছিল বাড়ি নিয়ে। এ কারণে এরা তার মেয়েকে হত্যা করেছে, এটি সন্দেহ। এটি পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য। পারিপার্শ্বিক সাক্ষের ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট তাদের সাজা বহাল রেখেছিল। আপিল বিভাগ বলেছে, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে যে ধরনের সাক্ষ্য আইনগতভাবে দরকার, সে সাক্ষ্য এখানে নেই।’
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোন্দকার দিলীরুজ্জামান বলেছিলেন, বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট পারিপার্শ্বিক ঘটনা ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে শাস্তি দিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ আদালত সেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। তিনি বলেন, রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে রিভিউর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সেসময়ে জানিয়েছিলেন।
শেষ ধাপ রিভিউর: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেছিলেন, ‘এখন রায়ের অনুলিপি পাওয়া সাপেক্ষে ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ করার সুযোগ আছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে কি না, তা পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে বোঝা যাবে। আপিল বিভাগের রায়ের পর এই মামলায় পুনর্বিচার ও পুনঃ তদন্তের কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করিয়েছে, তারা কেউ দোষী সাব্যস্ত হলো না। কিন্তু এটি স্বীকৃত যে বুশরা খুন হয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছে, তা প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্র।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছিলেন, একই থানার পুলিশ অফিসার যাদের তদন্ত করতে দেয়, আবার আইনশৃঙ্খলার জন্য মাঠেও নামায়। সে কারণে তাঁরা অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন না। এ কারণে ফৌজদারি মামলার জন্য আলাদা তদন্ত সেল করা দরকার। বেশির ভাগের ক্ষেত্রে তদন্ত সঠিকভাবে করা হয় না বলে অযথা অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়। আবার এ-ও দেখা যায়, যে ধরনের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল, তা সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয় না। এই মামলায় পুনরায় তদন্ত বা পুনর্বিচারের সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেছিলেন, খালাসও বিচারের আওতায়, সাজাও বিচারের আওতায়। তবে এখন রাষ্ট্রপক্ষ এ ব্যাপারে রিভিউ করতে পারে।

