নিজ বাসায় ধর্ষণের শিকার হন ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানা। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়। একইদিন হত্যার শিকার হন তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরীও। প্রায় এক যুগ আগে খুলনার লবণচরা এলাকায় সংঘটিত ধর্ষণ ও ডাবল হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত দুটি মামলার বিচার করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়ে মামলার পাঁচ আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। ওই মৃত্যুদন্ড নিশ্চিতকরনে ডেথ রেফারেন্স আসে হাইকোর্টে। সাত বছর পর দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য পাঠানো হয় হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে। কিন্তু দুটি মামলার মধ্যে একটি মামলার বিচার দন্ডবিধিতে হওয়ায় তার ডেথ রেফারেন্স না শুনে কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছে হাইকোর্ট।
তবে দুটি মামলার বিচার যেন বিশেষ বেঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সেজন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি আবেদন দিয়েছেন মামলার বাদী। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুটি মামলা একই ঘটনা হতে উদ্ভুত। সাক্ষ্য-প্রমাণ একই। পৃথক পৃথক বেঞ্চে বিচার কাজ হলে ভিকটিমের পরিবার ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। সেজন্য দন্ডবিধিতে দায়েরকৃত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স বিশেষ বেঞ্চে শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হলো।
২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খুলনার লবণচরা এলাকার বুড়ো মৌলভীর দরগাহ পাড়ায় ঢাকাইয়া হাউজে বাবা ইলিয়াস চৌধুরী ও তার মেয়ে পারভীন সুলতানাকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করেন পাঁচ আসামি। হত্যার পর তাদের লাশ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়। পরে আসামিরা দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রথমে লবণচরা থানায় দন্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন পারভীনের ভাই রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব। মামলার তদন্ত পর্যায়ে গ্রেপ্তার করা হয় আসামি মো. লিটনকে। গ্রেপ্তারের পর আসামি লিটন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে উঠে আসে হত্যার আগে ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীনকে ধর্ষণ করেন আসামিরা। পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
এই জবানবন্দির পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় ঘটনার চারদিন পর ২২ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলার বিচার হয় খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এ। সাক্ষ্যগ্রহন, জেরা, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে দুটি মামলায় রায় দেওয়া হয়।
রায়ে পারভীন ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি মো. লিটন, সাইফুল ইসলাম পিটিল, আবু সাঈদ, আজিজুর রহমান ওরফে পলাশ ও শরিফুল আলমকে মৃত্যুদন্ড এবং প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদন্ড দেওয়া হয়।
আর ইলিয়াস চৌধুরী হত্যা মামলায় দন্ডবিধির ৩০২ ধারায় এই পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদন্ড এবং ২০১ ধারায় লাশ গুমের অভিযোগে সাত বছর সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে বিচারিক আদালত কর্তৃক দেওয়া এই রায় কার্যকরে ডেথ রেফারেন্স আসে হাইকোর্টে। দীর্ঘ সাত বছর পর দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চেকে শুধুমাত্র নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলা সংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তির এখতিয়ার প্রদান করা হয়। ফলে ইলিয়াস চৌধুরী হত্যা মামলাটি দন্ডবিধির আওতায় হওয়ায় ডেথ রেফারেন্সটি কার্যতালিকা থেকে মঙ্গলবার বাদ দেয় হাইকোর্ট।
এরপর গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন দেন মামলঅর বাদী। ওই আবেদনে একই ঘটনা হতে উদ্ভুত দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স বিশেষ বেঞ্চে একত্রে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. ইমাম হোসেন তারেক বলেন, মামলা দুাটি একই ঘটনা থেকে উদ্ভুত। সাক্ষ্য-প্রমাণ একই। দুটি বেঞ্চে বিচার কাজ হলে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা করছেন মামলার বাদী। ন্যায় বিচারের স্বার্থে একই বেঞ্চে মামলা দুটির ডেথ রেফারেন্স একত্রে শুনানি ও নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। একই মত মামলার বাদীর কৌসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ আসাফুর আলী রাজা। তিনি বলেন, বিশেষ বেঞ্চে দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য যাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন প্রধান বিচারপতি সেজন্য আমরা একটি আবেদন দাখিল করেছি। এখনো সিদ্ধান্ত পাইনি।

