১০ বছরের শিশু আয়নী। যাকে বিড়ালছানার লোভ দেখিয়ে নেওয়া হয় একটি ফ্ল্যাটে। সেখানে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা করা হয়। নৃশংস এই হত্যা মামলায় সবজি বিক্রেতা রুবেলকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও ফ্ল্যাট মালিকের সাক্ষ্যে ঘটনাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় রাষ্ট্রপক্ষ।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ে বিচারক বলেছেন, নিরপরাধ শিশু আয়নীর প্রতি সংঘটিত অপরাধ অত্যন্ত নির্মম। শিশুরা পৃথিবীকে সন্দেহ করতে শেখেনি। একটি বিড়ালছানার প্রতিশ্রুতি শিশুর কাছে যে সরল আনন্দের, সেই সরল আনন্দকেই এখানে অপরাধের ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান এ পর্যবেক্ষণ দেন।
রায়ে বিচারক বলেন, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। তিন মাসের পরিকল্পনার পরিণতি এই হত্যাকাণ্ড। হত্যার পর আট দিন ধরে মৃতদেহ লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যখন শোকার্ত পরিবারটি সন্তানের খোঁজে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। এই দীর্ঘ সময়েও আসামির মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। আসামি যে অপরাধ করেছে তার ভয়াবহতা এসব মানবিক বিবেচনাকে ছাপিয়ে গেছে। আইন নিরপরাধকে শাস্তি দেয় না। সবদিক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, মৃত্যুদণ্ডই আসামির একমাত্র উপযুক্ত সাজা। গত সোমবার এ রায় দেন বিচারক।
চট্টগ্রামে ২০২৩ সালের ২১ মার্চ বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৪টায় শিশু আবিদা সুলতানা আয়নী প্রতিদিনের মতো আরবি পড়তে বাসা থেকে বের হয়। এরপর সে আর ফিরে আসেনি। এলাকার সবজি বিক্রেতা রুবেল শিশুটির দাদির কাছে নিয়মিত সবজি বিক্রি করত।
রায়ে উঠে এসেছে যে, আসামি প্রায় তিন মাস ধরে বিড়ালের বাচ্চা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটির স্নেহ ও বিশ্বাস অর্জন করেছিল। ঘটনার আগের দিন ২০ মার্চ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আসামি তার ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে শিশুটির সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলছে। পরদিন ২১ মার্চ বিকালে সেই বিড়ালছানার প্রলোভন দেখিয়েই শিশুটিকে একটি চার তলা ভবনের চতুর্থ তলার একটি তালাবদ্ধ ফ্ল্যাটে ডেকে নেয়। ভাড়াটিয়া তার কবুতরগুলোকে খাবার দেওয়ার জন্য ঐ ফ্ল্যাটের চাবি আসামির কাছে রেখে গিয়েছিলেন। ঐ ফ্ল্যাটে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। শিশুটি চিৎকার করে দরজার দিকে ছুটে যায়। তখন আসামি তার গলা চেপে ধরে এবং মুখে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে।
হত্যার পর মৃতদেহটি দুটি চটের বস্তায় ভরে বস্তার মুখ নাইলনের রশি দিয়ে বাঁধে। এশার নামাজের সময় রাস্তা ফাঁকা হলে সে মৃতদেহ কাঁধে করে নামিয়ে নিজের সবজি বিক্রির ভ্যানে তুলে আলমতারা পুকুর পাড়ের ময়লার স্তূপে ফেলে দেয়। শিশুটির বোরকা, কালো ফুলপ্যান্ট ও স্যান্ডেল একটি লাল ব্যাগে ভরে সে কলকা সিএনজি পাম্পের দক্ষিণ পাশের কালভার্টের নিচে নালায় ফেলে। টানা আট দিন পরিবার শিশুটিকে খুঁজে বেড়িয়েছে। আসামি রুবেল শিশুটির পরিবারের সঙ্গে খোঁজাখুঁজিতে অংশ নিয়েছে। এমনকি ফোনে শিশুটির দাদিকে বলেছে সে কিছু জানে না। যদিও প্রতিদিন গিয়ে দেখে এসেছে লাশ ঠিক জায়গায় আছে কি না। অবশেষে ২৯ মার্চ ভোরে গ্রেফতারের পর আসামির দেখানো ও শনাক্ত মতে ঐ পুকুর থেকে শিশুটির অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। নালার নিচ থেকে লাল ব্যাগসহ শিশুটির কাপড় উদ্ধার করা হয়। ম্যাজিস্ট্রের কাছে আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষে ২৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে আদালত। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হয়। যুক্তিতর্ক শেষে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন বিচারক।
রায়ে বিচারক বলেন, মামলায় হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই। মামলাটি পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে সেই পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের শৃঙ্খল কোথাও ছিন্ন হয়নি। আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিল। পরীক্ষা করে দেখা গেছে ঐ জবানবন্দি স্বেচ্ছায় এবং সত্য প্রণোদিত। পরে ঐ জবানবন্দি প্রত্যাহারের চেষ্টা করা হলেও সেই প্রত্যাহার বিলম্বিত এবং ভিত্তিহীন।
বিচারক বলেন, মামলায় এক জন স্বতন্ত্র সাক্ষী হলেন ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া। যার সঙ্গে ভিকটিমের পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই। উনি সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ঢাকায় যাওয়ার সময় কবুতরকে খাবার দেওয়ার জন্য ফ্ল্যাটের চাবি আসামির কাছে রেখে গিয়েছিলেন। আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সঙ্গে এই সাক্ষ্য হুবহু মিলে যায়। এত ক্ষুদ্র ও অস্বাভাবিক একটি তথ্য কেউ সৃজন করতে পারে না। ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে যে উদ্ধারকৃত অর্ধগলিত মৃতদেহটি ভিকটিম শিশুটিরই এবং সে তার পিতামাতার সন্তান। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং চিকিৎসা সাক্ষ্য থেকে মৃত্যুর কারণ প্রমাণিত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৃতদেহ এবং কাপড় দুটি আলাদা গোপন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে কেবল আসামির দেখানো মতে। আট দিন ধরে পরিবার, এলাকাবাসী ও পুলিশ খুঁজেও এই দুটি স্থানের সন্ধান পায়নি। একমাত্র যে ব্যক্তি জিনিসগুলো সেখানে লুকিয়েছিল, সে-ই জানত সেগুলো কোথায় আছে। সব সাক্ষ্য ও নথি পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেছে যে রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ কারণে আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো।

