Homeজাতীয়ইলিয়াস আলীকে গুম করেন র‍্যাবের জিয়াউল আহসান

ইলিয়াস আলীকে গুম করেন র‍্যাবের জিয়াউল আহসান

  • বডিগার্ড হিসেবে দেখেছি “স্যার ওই সময়ে মাথায় গুলি/ইনজেকশন
  • পুশ করে ১৫০/২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন”

আমার নাম ইমরুল কায়েস। আমার বর্তমান বয়স ৪৩ বৎসর। আমার চাকুরীর একটি পর্যায়ে ২০১০-২০১২ সাল পর্যন্ত র‍্যাব হেডকোয়ার্টারে প্রেষণে কর্মরত ছিলাম। কর্মরত থাকা অবস্থায় র‍্যাব হেডকোয়ার্টার ইন্টেলিজেন্স উইং এ চাকুরী করি। আমি ১০-০৮-২০১০ তারিখে র‍্যাবে পোস্টিং হয়ে আসি। আমরা যারা পোস্টিং হয়ে আসি প্রথমে আমাদের এডমিন উইংয়ে রাখা হয়। আমি ০৫-০৪-২০০১ তারিখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে আর্মার্ড কোরে যোগদান পরবর্তীতে র‍্যাবের বিভিন্ন ইউনিট বা সংস্থায় বদলী করা হয়। আমি বদলীর অপেক্ষায় ছিলাম। এ অবস্থায় সিভিল পোশাকে তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার (বর্তমানে অব, মেজর জেনারেল) র‍্যাব হেডকোয়ার্টারে আসেন। তিনি আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন। ২০০৪ সালে আমি তার অধীনে আর্মি কমান্ডো কোর্স করি। তখন উনি কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১-প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নে আমি তার অধীনে কর্মরত ছিলাম। তাছাড়া তখন তিনি আমাদের ব্যাটালিয়নে ক্যান্টিন অফিসার ছিলেন। তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো ছিলো।

দেখা হওয়ার পর স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, “কিরে ইমরুল তুই এখানে?” আমি স্যারকে তখন বলি, “স্যার আমার র‍্যাবে পোস্টিং হয়েছে”। স্যার জিজ্ঞেস করলেন কোথা থেকে আমার পোস্টিং হয়েছে? আমি বললাম, স্যার আমার ১২ ল্যাপার থেকে পোস্টিং হয়েছে। তখন স্যার আমার নাম ও নাম্বার দিতে বলেন। আমি আমার নাম ও নাম্বার স্যারকে দেই। তার দুই তিনদিন পরেই র‍্যাবের (ইন্টেলিজেন্স) উইংয়ে পোস্টিং হয়। এরপর আমি ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের স্বাভাবিক ডিউটি যেমন, স্ট্যান্ডবাই প্রেট্রোল, এয়ারপোর্ট ডিউটি, র‍্যাবের বিভিন্ন ইউনিটে যেখানে আমরা সংযুক্ত থাকি সেখানে ডিউটি করতে থাকি। আমি মোহাম্মদপুর ক্যাম্পে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় সিনিয়র ডিএডি (নাম মনে নেই) আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, “ইমরুল তোমাকে ডাইরেক্টর ইন্টিলেজেন্সের রানার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে”। যা র‍্যাবে বডিগার্ড হিসেবে বলা হয়।

জিয়াউল স্যারের রানার থাকা অবস্থায় আমার কাজ ছিলো সব সময় স্যারের সাথে থাকা এবং স্যার যেখানে প্রয়োজন মনে করতেন সেখানে আমাকে নিয়ে যেতেন। স্যারের সাথে আমি বিভিন্ন জায়গায় যেমন জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি হেডকোয়ার্টার, ডিবির প্রধান কার্যালয় (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনির স্যার) ইত্যাদিতে যেতাম। মাঝে মাঝে সচিবালয়ে যেতাম। এছাড়া স্যার বিভিন্ন ব্যক্তির বাসায় যেতেন। তার মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকীর (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিকিউরিটি চীফ এডভাইজার) বাসায় যেতেন। আমিও স্যারের সাথে যেতাম। তারেক সিদ্দিকী স্যারের সাথে জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিলো। তারেক সিদ্দিকী স্যারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সাথেও আমার স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিলো। জিয়া স্যার যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন তখন তার গাড়ীতে অস্ত্র-এ্যামোনিশন থাকতো কিন্তু জিয়া স্যারের গাড়ি বিধায় তা তল্লাশি করা হতো না। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ যেমন মাহবুবুল হক হানিফ, আমির হোসেন আমু এবং জাহাঙ্গীর কবীর নানকদের সাথেও জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিলো। স্যার তাদের বাসায় যেতেন।


রানার হিসেবে যোগদান করার ২০/২৫ দিন পরে রাত আনুমানিক ১২.০০/১২.৩০টার দিকে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, “কই তুই?” আমি বলি আমি লাইনে আছি। স্যার তখন আমাকে র‍্যাব-১ এর সামনে যেতে বলেন। ওখানে যাওয়ার পর দেখি দুটি কালো রংয়ের হায়েস মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। স্যার আমাকে একটি মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। আমি সেই গাড়িটিতে উঠি। ঐ গাড়িতে জিয়া স্যার বসে ছিলেন। গাড়িতে উঠার পর স্যার আমাকে বলেন, পিছনে একটি বস্তা আছে, বস্তাটি ফেলে দিতে হবে। ঐ গাড়িতে র‍্যাব-১ এর সিও রাশেদ স্যার এবং ক্যাপ্টেন কাউসার স্যার ছিলেন। আরো দুইজন ছিলেন আমি তাদেরকে চিনি না। রাত আনুমানিক পৌনে একটার দিকে র‍্যাব-১ থেকে বের হয়ে জসীম উদ্দিন হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভার ব্রীজের উপর দিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে বেশ কিছুদুর যাই। যাওয়ার পর সেখানে একটি রেল ক্রসিং পড়ে, রাস্তার দুই পাশে গাছ-গাছালি ছিলো, সেখানে আমাদের গাড়িগুলো থামে। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন যে, ইমরুল ডিক্রিটা খুল, বস্তাটা বের কর”। আমি ডিক্তি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশে হাত দিলে দেখি সেটি বস্তা না বরং একটা ডেড বডি ছিলো এবং ঠান্ডা ছিলো। প্রথম অবস্থায় আমি ভয় পেয়ে যাই। আমার সাথে যারা ছিলো তাদের সহায়তায় বডিটা রেল লাইনের পাশে নিয়ে রাখি। স্যার সেখানে দাঁড়ানো ছিলো। বডিটা সেখানে রেখে আমি মাইক্রোতে চলে আসি। তখন দেখি যে, জিয়া স্যারসহ সেখানে থাকা অন্যরা বডিটা রেল লাইনের উপরে রাখেন এবং তারা গাড়িতে ফিরে আসেন। তার কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়। তারপর আমরা ওখান থেকে চলে আসি।

লাইনে ফিরে আসার পর ৫/৭ দিন আমি অস্বাভাবিক ছিলাম। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিলো যে, আমি কোথায় আসলাম, কিভাবে চাকুরী করবো। আমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারছিলাম না।


“সুন্দরবন অপারেশনে যাই
অপারেশনটি সাজানো মনে হয়েছিল”

এই ঘটনার কিছুদিন পর আমি জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে সুন্দরবন অপারেশনে কয়েকবার যাই। তার মধ্যে একটি অপারেশনের কথা আমার মনে আছে। আমরা বোটে করে সুন্দরবন অপারেশনস্থলে যাই। ঐ সময় সেখানে নদীর ভাটা ছিলো। আমাদের সাথে র‍্যাব-৮ এর সদস্যরাও ছিলেন। আমাদের বোট থামার পর জঙ্গলের ভিতর থেকে ২/৩ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমাদেরকে ফায়ার করার নির্দেশ দেওয়া হলে আমরা র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সের সদস্যরা এবং র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা ফায়ার করি। ভাটা থাকার কারনে কাদায় আমাদের হাটু পর্যন্ত ডেবে যাচ্ছিলো। এক পর্যায়ে আমাদের ফায়ার বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। সেখানে জিয়াউল আহসান স্যার, র‌্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার এবং মিডিয়ার সদস্যরাও উপস্থিত ছিলো। আমরা জঙ্গলের ভিতরের দিকে যাই এবং দেখি সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২/৩ টি লাশ পড়ে আছে। গাছের ডালপালা দিয়ে সেখানে একটি হাঁটার রাস্তা দেখতে পাই। রাস্তার দুই পাশ দিয়ে ছোট ছোট ঘর ছিলো। সেখানে জলদস্যুরা বসতে পারতো। সবগুলো ঘরই গাছের ডাল দিয়ে তৈরী ছিলো। একটি গাছের উপর একটি ওপি (অবজারভেশন পোস্ট) যার চারপাশে বুলেটপ্রুফ পাত লাগানো ছিলো, দেখতে পাই। এছাড়া আমরা দুটি বোট দেখতে পাই। বোট গুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যাদি ছিলো যেমন, সিগারেট, মদের বোতল, বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী ও একটি ছাগলও ছিলো। ছাগলটি আমরা দুপুরের খাবারের সময় জবাই করে খেয়েছিলাম। এই অপারেশনটি আমার কাছে একটি সাজানো অপারেশন মনে হয়েছিলো।


“পিলখানায় বিদ্রোহের পর বিডিআরের ৮/১০
জনকে হত্যা করেন জিয়াউল স্যার”

বিডিআর হত্যাকান্ডের পর সারাদেশে “অপারেশন রেবেল হান্ট” নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্য। ঐ সময় জিয়াউল আহসান স্যার ৮/১০ জন লোককে হত্যা করেন। যাদেরকে হত্যা করেছেন তারা বিডিআর সদস্য ছিলো এবং আমাদের অফিসারদের এরা হত্যা করেছে মর্মে জিয়া স্যার বলেছেন। এই লোকগুলোকে দুই ভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি ছিলো ইনজেকশন পুশ করে এবং আরেকটি ছিলো পোস্তগোলা ব্রীজের নিকট আর্মি ক্যাম্প আছে তার ভিতর দিয়ে বোটে করে নদীতে নিয়ে রাখা হতো, তার উপর যে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে তাকে রাখা হতো, তার সিমেন্ট ভরা একটি বস্তা নিচে উপর আরেকটি সিমেন্ট ভরা বস্তা রেখে রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বেবে ফেলা হতো। পরে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।


জিয়াউল ২০১১ সালের রমজান মাসের শেষের দিকে আমি লাইনে ছিলাম। একদিন ইফতারের পূর্ব মুহুর্তে উত্তরা আহসান স্যার ফোন দিয়ে আমাকে ক্যামেরা নিয়ে নর্থ টাওয়ারের ওখানে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে আমি স্যারকে পাইনি। একটু পরে জিয়া স্যার ফোন দিয়ে আমাকে আরেকটু সামনে যেতে বলেন। ঐ দিন আমি ইফতার করতে পারিনি। নর্থ টাওয়ার থেকে সামনে গিয়ে দেখি চারজন লোককে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। যারা নাকি ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলো। এই অপারেশনটা সাজানো ছিলো।


“পোস্তগোলায় ১১ জনকে হত্যা করা হয়”

২০১২ সালের প্রথমের দিকে তিনটি মাইক্রোতে করে আমরা ১১ জন আসামী নিয়ে জিয়াউল নেতৃত্বে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের ওখানে যাই। সেখানে ঐ ১১ জন আসামীকে বোটে উঠানো হয়। জিয়া স্যার ব্যবহার করেছিলো স্যার কাছে ডাকলে গিয়ে দেখি এই বোটটি সেই বোট যেটি সুন্দরবন অপারেশনে জলদস্যুরা ছলো। তখন হঠাৎ করে একজন আসামী পানিতে ঝাপ দেয়। জিয়া স্যার আমাকে বলেন, “ইমরুল ধর ধর”। স্যারের আদেশে আমি পানিতে ঝাপ দিয়ে উক্ত আসামীকে ধরি। রশির সাহায্যে ঐ আসামীকে বোটে উঠানো হয়। ঐ সময় অন্ধকার ছিলো। আমি আসামীকে চিনতে পারিনি। তবে তার বয়স আনুমানিক ২৫/২৬ বছর হবে। নদীতে ঝাপ দিয়ে আমি অনেক ময়লা পানি খেয়েছি। পরে পরে আমি বমি করি এবং দুর্বল হয়ে যাই। বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে পূর্বের ন্যায় এই ১১ জনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ঐ অপারেশনে জিয়া স্যার, মেজর নওশাদ স্যার, স্ক্রোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার, এডিজি (অপস) মুজিব স্যার ছিলেন। অপারেশন শেষে আমরা লাইনে চলে আসি।


“ভারত থেকে এনে দু’জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়”

২০১২ সালের মাঝামাঝি র‌্যাব-১ এর টিএফআই দেল থেকে দুইজন আসামী নিয়ে স্যারের নেতৃত্বে জাফলং বর্ডারে যাই। দুজন আসামীরই হাত বাঁধা এবং মাথায় জমটুপি। আমরা জিয়া পরানো ছিলো। দুজন আস আনুমানিক রাত ২.০০/২.৩০টার দিকে আমরা সেখানে পৌছাই। সেখানে ভারত থেকে মাসামী নিয়ে সিভিল পোশাকে ৪/৫ জন লোক এসে তাদেরকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। আমাদের কাছে থাকা দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করি। ভারত থেকে প্রাপ্ত দুজন আসামী নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করি। জাফলং বর্ডার থেকে আনুমানিক ২৫/৩০ কিলোমিটার আসার পর গাড়ি থেকে একজন আসামীকে নামানো হয় এবং জিয়াউল আহসান স্যার তাকে গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন। ঐ সময় স্যারের নির্দেশে আমি এবং অন্য একজন গাড়ির সামনে এবং পিছনে সিকিউরিটি হিসেবে দাঁড়াই। অন্য আসামীকে নিয়ে রওনা করে ১০/১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর একই ভাবে তাকে জিয়াউল আহসান স্যার গুলি করে হত্যা করেন।


“স্যার আপনাদের কথামতো
ইলিয়াসকে গলফ (গুম) করলাম”

২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র‌্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার এবং মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই। কাকে গাড়িতে পিক করবে তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। টার্গেট কখন আসবে তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে, টার্গেট আসবে না। পরে সেখান থেকে জিয়া স্যারকে বাসায় নামিয়ে দেই এবং স্যারকে বলে পরের দিন সকালে আমি নয় দিনের ছুটিতে যাই। ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, ইলিয়াস আলী নামক একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভার ব্রীজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। নয় দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি আমার কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করি। অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি যে, কোতের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন। সাধারণত Fall in (Roll Call) সকাল ৯.০০টায় হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিল থেকে সকাল ৭.০০টায় Fall in (Roll Call) হতো এবং জিয়া স্যার পরপর বেশ কয়েকদিন Fall in (Roll Call) এর সময় এসেছিলেন। জিয়া স্যারের থাকা অবস্থায় একদিন জিয়া স্যার ফোনে কোন একজনের সাথে কথা বলছিলেন। ঐ সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল আসলে স্যার বলেন, “তুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন”। জিয়া স্যার তারেক স্যারের সাথে কথা বলা শুরু করেন। অপর প্রান্তে কি বলেছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, “স্যার আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে, এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো”।

“আসামীর মাথায় অনেক চুল থাকার
কারনে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিলো”

তার বেশ কিছুদিন পরে র‌্যাব-৪ এর সেইফ হাউজ থেকে দুজন আসামীকে দুইটা মাইক্রোতে নেওয়া হয়। আনুমানিক আধাঘন্টা চলার পর গাড়িটি তিন মাথার মোড়ে এক জায়গায় থামানো হয়। ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের উত্তরে সাক্ষী পরে বলেন, গাড়ি দুটি থামানো হয়। আমি যে গাড়িতে ছিলাম সে গাড়ি থেকে একজন আসামীকে নামানো হয়। আমি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। জিয়াউল আহসান স্যার ঐ আসামীকে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন এবং হত্যা করেন। ঐ আসামীর মাথায় অনেক চুল থাকার কারনে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিলো। তা দেখে উপস্থিত সকলে হাসাহাসি করছিলো। ঐ আসামীর হাত এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা ছিলো। আসামীকে হত্যা করার পর আমরা গিয়ে স্যারের নির্দেশে গামছাগুলো খুলে নিয়ে এসে গাড়িতে বসি। আমাদেরকে আমাদের গাড়ি নিয়ে র‌্যাব-৪ এ চলে যেতে বলেন। জিয়া স্যার অপর আসামীকে নিয়ে চলে যান। জিয়া স্যার যখন র‌্যাব-৪ এ ফেরত আসেন তখন ঐ আসামী তার সাথে ছিলো না। কিছু কিছু অপারেশন স্যার আমার অগোচরে করতেন। যেটাতে তিনি প্রয়োজন মনে করতেন সেটাতে আমাকে নিয়ে যেতেন।


“মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পর পর দুটি গুলি
করেন এবং ব্রীজ থেকে যখন ফেলে দেয়”

এই ঘটনার এক/দুই সপ্তাহ পর আমি লাইনে কেরাম খেলতেছিলাম তখন জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, “র‌্যাব-১ সামনে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়ানো আছে সেখানে গিয়ে ঐ গাড়ীতে ওঠো”। আমি স্যারের আদেশ শুনে গাড়ীতে গিয়ে উঠি এবং দেখতে পাই মেজর নওশাদ স্যার গাড়ীতে বসা আছেন এবং দুইজন আসামী (পরে বলেন) টার্গেট জম টুপি পরা অবস্থায় গাড়ীর ভিতরে বসে আছে। কিছুক্ষন পরে জিয়াউল আহসান স্যার রাস্তার অপর পার্শ্বের একটি প্রাইভেট কারে এসে নামেন তারপর রাস্তা পার হয়ে আমাদের গাড়ীতে এসে ওঠেন। আমরা যাত্রা শুরু করে টঙ্গী হয়ে, আহসান উল্যাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর ব্রীজের উপরে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন, “ইমরুল নামো”। আমি স্যারের আদেশ অনুযায়ী গাড়ীর পাশেই দাঁড়াই গার্ড দেওয়ার জন্য। তখন জিয়া স্যার একজন টার্গেটকে গাড়ী থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পর পর দুটি গুলি করেন এবং ব্রীজ থেকে যখন ফেলে দেয় তখন টার্গেটের লুঙ্গী খুলে দেয়। ব্রীজ থেকে টার্গেটকে নদীর পানিতে ফেলে দেয়। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে টার্গেটকে নদীর পানিতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছিলো। তখন একই ভাবে মেজর নওশাদ স্যার পরবর্তী টার্গেটকেও গুলি করে হত্যা করে এবং লুঙ্গী খুলে পানিতে ফেলে দেয়।


“টার্গেটগুলোর পেট কমান্ডো
নাইফ দিয়ে চিরে ফেলা হতো”

এই ঘটনা ছাড়াও আমি বেশ কয়েকবার জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে বরিশালে গিয়েছিলাম এবং র‌্যাব-৮ এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চর দুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদীর ভিতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনও দুই জন, কখনও তিন জন, কখনও চার জন টার্গেটকে পূর্বের ন্যায় হত্যা করে, অর্থাৎ সিমেন্টের বস্তা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। বস্তা বেঁধে লাশ পানিতে ফেলার পূর্বে ঐ টার্গেটগুলোর পেট কমান্ডো নাইফ দিয়ে চিরে ফেলা হতো।


“বিভিন্ন পন্থার মধ্যে গুলি করে এবং
ইঞ্জেকশন পুশ করে হত্যা করতেন”


জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে আমি এক বছর তিন/চার মাস বডিগার্ড বা রানার হিসাবে থাকা অবস্থায় আমি লক্ষ্য করি যে, তিনি বিভিন্ন ভাবে আসামীদের গুম করতেন। তিনি র‌্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। এই বিভিন্ন পন্থার মধ্যে ছিলো গুলি এবং ইঞ্জেকশন। পূর্বের বর্ণিত ঘটনা ছাড়াও আরো ১০/১২ জন ব্যক্তিকে ইঞ্জেকশন পুশ করে হত্যা করেছেন। এই ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করার কাজটি কখনও টিএফআই সেলের ভিতরে, কখনও গাড়ীতে সংঘটিত হতো। আমি র‌্যাব থেকে চলে যাওয়ার পরে আমি আগের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারি নাই (সাক্ষী এ পর্যায়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে)। আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি তবে তা কখনই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসাবে তার সাথে দেখেছি তিনি ঐ সময়কালে ১৫০/২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করি। কোন সৈনিককে কখনই যেনো আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা একাধিকবার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। বর্তমানে আমি ওয়ারেন্ট অফিসার হিসাবে রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত আছি। আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, এখন আমি নিরাপত্তা চাই। এই আমার জবানবন্দি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments