Homeঅপরাধবৈষম্যবিরোধী নেতার মামলা-বাণিজ্য, আসামির তালিকায় মৃতরাও

বৈষম্যবিরোধী নেতার মামলা-বাণিজ্য, আসামির তালিকায় মৃতরাও

মারজুকের বিরুদ্ধে টোল প্লাজায় ডাকাতির অভিযোগও রয়েছে

খান রুবেল, কালবেলা

বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের। এবার বরিশালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এক নেতার বিরুদ্ধে মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের চারজন মৃত নেতা। এমনকি মামলার আবেদনের আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ফোন করে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা করে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এই নেতা হলেন মারজুক আব্দুল্লাহ। বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তি বরিশাল মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পরপর তিন দিন বরিশাল নগরীর একই এলাকায় ‘আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সড়ক অবরোধ ও মিছিল করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা’। ছাত্র-জনতা তাদের প্রতিহত করতে গিয়ে ছুড়েছেন ককটেল এবং পেট্রোল বোমা—এমন অভিযোগ এনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের ২৪৮ জন নেতাকর্মীর নামে এবং অজ্ঞাত আরও ৬০-৮০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক বহিষ্কৃত নেতা মারজুক আব্দুল্লাহ। আসামির তালিকায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের চারজন মৃত নেতার নাম। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, অন্যদের সঙ্গে এই চার মৃত ব্যক্তিও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পালন করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। করেছেন সড়ক অবরোধ, মিছিল ও বোমা বিস্ফোরণ।

এমন কাল্পনিক ও হাস্যকর মামলা নিয়ে বরিশালজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা আলোচনা-বিতর্ক। অভিযোগের সত্যতা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। মূলত বাণিজ্য করতেই ‘বিতর্কিত’ মারজুক আব্দুল্লাহ আদালতে এমন নালিশি মামলা করেছেন বলে অভিযোগ মামলার অনেক আসামির।

এমনকি মামলার আবেদনের আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ফোন করে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা করে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মামলার বাদী মারজুক আব্দুল্লাহ। মৃত ব্যক্তিদের মামলার আসামি করার বিষয়টি সাক্ষীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন তিনি।

মামলার বাদী মারজুক আব্দুল্লাহ বরিশাল নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ক্লাব রোডের বাসিন্দা। ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক ছিলেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বরিশাল জেলার যুগ্ম সদস্য সচিব ছিলেন। সংগঠনের নাম ব্যবহার করে মামলা বাণিজ্যের অভিযোগে ওই সময় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তি বরিশাল মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন মারজুক। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পটুয়াখালীতে টোল প্লাজায় একটি ডাকাতি মামলার আসামিও তিনি।

জানা গেছে, গত ২ জুলাই বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২৪৮ জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবিরোধী ও হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ এনে নালিশি মামলার আবেদন করেন মারজুক আব্দুল্লাহ। মামলায় তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনে ১০, ১৬ ও ২২ জুন প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মিছিল, গোপন বৈঠক, সড়ক অবরোধ, ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ করেন।

পাশাপাশি মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন। নালিশি মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরিয়ত উল্লাহ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলার ১৯৫ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি মোহাম্মদ আলী হাওলাদার। তিনি বিসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০২১ সালের ২৬ জুলাই সকাল সাড়ে ৮টায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

অন্যদিকে মামলার ১৯৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি আবুল ফারুক হুমায়ুনকে। তিনি ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ মারা যান।

একইভাবে ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করা ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি খন্দকার রেজাউর রহমান রেজাকে ২১২ এবং ২০২১ সালের ২০ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করা ২২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার এইচ এম হাফিজুর রশিদ শিবলীকে ২২৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

মামলার নথিতে বাদী মারজুক আব্দুল্লাহ অপরাধের তিনটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে প্রথমটি ১০ জুন সন্ধ্যা ৭টায় এয়ারপোর্ট থানাধীন ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিপুর মৃত্তিকা ভবন এলাকা, দ্বিতীয়টি ১৬ জুন সন্ধ্যা ৭টায় একই থানাধীন ভাঙ্গারপোল এবং তৃতীয় ঘটনাটি ২২ জুন সন্ধ্যা ৭টায় মৃত্তিকা ভবন এলাকায় ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ করা হয়, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তিনটি এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সড়ক অবরোধ, মিছিল ও গোপন বৈঠক করেছেন।

মামলার তৃতীয় অর্থাৎ ২২ জুন সন্ধ্যায় মৃত্তিকা ভবন এলাকার ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চার মৃত নেতাকে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তারা মিটিং ও মিছিল করছিলেন। খবর পেয়ে বাদীসহ সাক্ষীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। তখন অন্য আসামিদের সঙ্গে উল্লিখিত চার নেতাও (যারা মারা গেছেন) তাদের গায়ে বিস্ফোরক দ্রব্য মেরে হামলা করেন। এর মধ্যে খন্দকার রেজাউর হাতবোমা এবং আবুল ফারুক ও হাফিজুর রশিদ ককটেল ছুড়েছেন।

এদিকে, মামলায় মৃত নেতাদের আসামি করা নিয়ে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি মামলায় অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতারও মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেননা মামলায় উল্লেখ করা সময় এবং এলাকায় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এয়ারপোর্ট থানার ওসি (তদন্ত) সুমন কুমার আইচ। তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এয়ারপোর্ট থানা এলাকায় কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি।’

মামলায় আসামি হিসেবে নাম থাকা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের বরিশাল জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর রাজিব হোসেন খান অভিযোগ করেছেন, নির্দেশদাতা হিসেবে মামলায় আমার নাম রয়েছে। মূলত বাণিজ্য করতেই মারজুক আব্দুল্লাহ মামলার ফাঁদ পেতেছেন। মামলায় নাম ঢোকানো এবং বাদ দেওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের ফোন করে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে ৫-১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করেছেন। যারা দেননি তাদেরই মামলায় আসামি করা হয়েছে।

এমন অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন মামলার আসামি নিলয় আহম্মেদ রাব্বি ওরফে রাইডার রাব্বি। মারজুক আব্দুল্লাহ নিজেই ফোন করে তার কাছে পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছিলেন বলে জানান রাব্বি। টাকা না দেওয়ায় মামলার ৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে রাব্বিকে। রাব্বি বরিশাল নগরীর কলাপট্টি এলাকার জয়নাল হাজারীর ছেলে।

এদিকে, মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে মারজুক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সাক্ষীদের ভুল তথ্যের কারণে এমনটা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’

বরিশাল মেট্রোপলিটন আদালতের সরকারি আইন কর্মকর্তা-এপিপি হাফিজ আহমেদ বাবলু বলেন, মামলায় মিথ্যা তথ্য এবং মৃত ব্যক্তিকে আসামি করাটাও একটি অপরাধ। আমরা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, অথচ এই মামলাটি সম্পর্কে আমরা কেউ কিছু জানি না। বিজ্ঞ আদালত বিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে মামলার তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। আমরা মনে করি, এ মামলাটির কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা হবে এবং মামলার সত্যতা কতটুকু তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৪ মে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমুসহ ২৪৭ জনের নামে জুলাই অভ্যুত্থানে হামলার মামলা করেছিলেন বরিশাল নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ক্লাব রোডের বাসিন্দা মারজুক আব্দুল্লাহ। সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাই সংবাদ সম্মেলন করে মারজুকের বিরুদ্ধে মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ করেন। এমনকি ওই সময় সংগঠন থেকে তার পদ স্থগিত করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ৬ জুন পটুয়াখালীর পায়রা সেতুর টোল প্লাজায় ডাকাতির অভিযোগে মারজুক আব্দুল্লাহকে অভিযুক্ত করে দুমকী থানায় একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। দুমকী থানার উপপরিদর্শক নূরুজ্জামান বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় মারজুকসহ তিনজনকে আসামি করা হয়। মামলায় মারজুককে ‘পেশাদার ডাকাত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments