Homeবিচারপ্রার্থীর কান্নাবিচার বিভাগের পর্যাপ্ত বাজেট: সুশাসনের জন্য কৌশলগত বিনিয়োগ

বিচার বিভাগের পর্যাপ্ত বাজেট: সুশাসনের জন্য কৌশলগত বিনিয়োগ

এম এম খালেকুজ্জামান Contributor image

এম এম খালেকুজ্জামান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আর্থিক স্বাধীনতা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করে। এই চিন্তায় ভ্রান্তি থাকতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দকে রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলগত বিনিয়োগ(স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট) বিবেচনা করা হয়, এটি অভ্রান্ত সত্য।

বাজেটে বিচার বিভাগের জন্য যথাযথ বরাদ্দ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই অবতারণা। সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পর্যাপ্ত বাজেট একটি কৌশলগত বিনিয়োগ, এটি কল্যাণরাষ্ট্রগুলো বেশ আগেই বুঝেছে। আমরা বুঝতে পারিনি এখনো।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সক্ষমতার নিরিখে সুশাসন সূচকগুলো (যেমন বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটর বা চ্যান্ডলার গুড গভর্ন্যান্স ইনডেক্স) একটি দেশের অবস্থান নির্ধারণ করে ‘ভালো–খারাপ’ হিসেবে।

পরিকাঠামোর (উড়ালসড়ক কিংবা আগামীর পদ্মা ব্যারাজ) উন্নয়ন সাধারণত দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য। অন্যদিকে সুশাসন দৃশ্যমান নয়, সুশাসন নাগরিক অভিজ্ঞতার বিষয়। সুশাসন হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা শাসক ও শাসিতের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। সুশাসন সূচকে ওপরে থাকা দেশগুলোর অন্যতম প্রধান অর্জন স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং সেটি স্বতন্ত্র এর পরিচালনা ও এর পরিচলন ব্যয়ে (বাজেটে)।

২.

প্রচলিত সংসদীয় গণতন্ত্রে বাজেট প্রণয়ন, পর্যালোচনা, অর্থাৎ পেশ ও পাসের এখতিয়ার সংসদের। রীতি মেনে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় সংসদে পরীক্ষা-পর্যালোচনার পর বাজেট পাস হয়।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিচার—এসবের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হওয়া যেন আমাদের নিয়তি। নতুন সরকারের নতুন উন্নয়ন দর্শন কি ভিন্ন কিছুর অভিজ্ঞতা দিতে পারে?

এর আগে আইনমন্ত্রীসহ সব মন্ত্রীই প্রধানমন্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে থাকতেন, যা পাওয়া যেত, তা–ই সই। এবারের আইনমন্ত্রী আগের চেয়ে ভিন্ন, বিচার বিভাগ বাজেট ইস্যুতে।

আগে বিচার বিভাগের জন্য সেই অর্থে বাজেট-পূর্ব অর্থ বরাদ্দ নিয়ে খুব একটা আলোচনা দেখা যায়নি। একটা ইতিবাচক দিক, এবার বাজেট প্রস্তুতির সময়ই বিচার বিভাগের জন্য প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট বরাদ্দের শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ। ১ শতাংশের অর্ধেকও বরাদ্দ পায়নি। অথচ নানাভাবে ১৫ হাজার কোটি টাকা জোগান দেয় বিচার বিভাগ, আইনমন্ত্রী সেটিও মনে করিয়ে দেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগের জন্য পরিচালন ও উন্নয়ন খাত মিলিয়ে এই টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়।

বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সংকটের উদাহরণ দিতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, একজন বিচারক সাক্ষীর জবানবন্দি লেখার সময় কাগজ শেষ হয়ে গেলে তা কেনার ক্ষমতাও রাখেন না। নতুন কাগজের জন্য দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় মামলার নতুন তারিখ দিতে হয়। এ ধরনের জটিলতা বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে তিনি মনে করেন। এ বাস্তবতা বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতীক।

৩.

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, নীতি ও উন্নয়নদর্শনের প্রতিফলন। সংসদ যেমন জাতীয় বাজেট অনুমোদনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার আর্থিক ভিত্তি নির্ধারণ করে, তেমনি বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

বিচার বিভাগের বাজেট নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই দেখা যায় কাঠামোগত অপ্রতুলতা আর মামলার জটের মতো তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো, কিন্তু বিচারব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গঠনের প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়। অথচ বিচার বিভাগের বাজেট কেবল ব্যয় নির্বাহের জন্য নয়; এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। এটি করা যায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারক নিয়োগ এবং তাঁদের যথাযথ আর্থিক ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।

উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতাকে বিচারিক স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ, নির্বাহী বিভাগের ওপর অতিমাত্রায় আর্থিক নির্ভরতা বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এ কারণে বিচার বিভাগকেই এর বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৪.

বিচার বিভাগের আধুনিকীকরণে বাজেট একটি বড় প্রশ্ন। ই-ফাইলিং, ভার্চ্যুয়াল শুনানি, ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ এবং আদালত ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশেও এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। অন্যথায় বিচার বিভাগ ক্রমবর্ধমান মামলাজট এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হতে পারে।

সর্বোপরি, রাষ্ট্রের সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, মানবাধিকার সুরক্ষার ভিত্তি হলো কার্যকর বিচারব্যবস্থা। আর কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত, পরিকল্পিত ও জবাবদিহিমূলক বাজেট বরাদ্দ।

বিচার বিভাগের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা মানে কেবল আদালতকে শক্তিশালী করা নয়; রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকেও সুদৃঢ় করা। তাই বিচার বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দকে বিশেষ সুবিধা নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, সুশাসনে বিনিয়োগের শেষ গন্তব্যই হলো একটি প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments