নিজ বাসায় ধর্ষণের শিকার হন ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানা। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়। একইদিন হত্যার শিকার হন তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরীও। প্রায় এক যুগ আগে খুলনার লবণচড়া এলাকায় সংঘটিত ধর্ষণ ও ডাবল হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের উপর রায় ঘোষণা করেছে হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ। রায়ে বাবা-মেয়ে হত্যা মামলায় পাঁচ আসামির মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে আদালত।
দন্ডিতরা হলেন মো. লিটন, সাইফুল ইসলাম পিটিল, আবু সাঈদ, আজিজুর রহমান ওরফে পলাশ ও শরিফুল আলম। তবে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ওই পাঁচ আসামির মৃত্যুদন্ড হ্রাস করে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ রায় দেন। রায়ে বলা হয়েছে, বাবা-মেয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা খুবই নির্মম। এ ধরনের হত্যাকান্ডের ঘটনায় আসামিদের অনুকম্পার কোন সুযোগ নাই। বিচারিক আদালত ফাঁসির যে রায় দিয়েছে তা বহাল রাখা হলো।
রায়ের পর সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের দায়িত্ব পালনকারী আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. ইমাম হোসেন তারেক বলেন, বাবার সঙ্গে মেয়েকেও হত্যা করেন আসামিরা। একইসঙ্গে মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হন। তবে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে বলা হয়েছে ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হলে আসামিদের সর্বোচ্ছ শাস্তি প্রাপ্য। কিন্তু এখানে ধর্ষণের ফলে মেয়েটির মৃত্যু হয়নি, যার কারনে ধর্ষণের মামলায় মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে আসামিদের যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে আদালত। তবে হত্যা মামলায় তাদের ফাঁসি বহাল রেখেছে হাইকোর্ট।
২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খুলনার লবণচড়া এলাকার বুড়ো মৌলভীর দরগাহ পাড়ায় ঢাকাইয়া হাউজে বাবা ইলিয়াস চৌধুরী ও তার মেয়ে পারভীন সুলতানাকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করেন পাঁচ আসামি। হত্যার পর তাদের লাশ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়। পরে আসামিরা দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রথমে লবণচড়া থানায় দন্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন পারভীনের ভাই রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব। মামলার তদন্ত পর্যায়ে গ্রেপ্তার করা হয় আসামি মো. লিটনকে। গ্রেপ্তারের পর আসামি লিটন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে উঠে আসে হত্যার আগে ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীনকে ধর্ষণ করেন আসামিরা। পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এই জবানবন্দির পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় ঘটনার চারদিন পর ২২ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়।
দুটি মামলার বিচার হয় খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এ। সাক্ষ্যগ্রহন, জেরা, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে দুটি মামলায় রায় দেওয়া হয়। রায়ে পারভীন ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি মো. লিটন, সাইফুল ইসলাম পিটিল, আবু সাঈদ, আজিজুর রহমান ওরফে পলাশ ও শরিফুল আলমকে মৃত্যুদন্ড এবং প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদন্ড দেওয়া হয়। আর ইলিয়াস চৌধুরী হত্যা মামলায় দন্ডবিধির ৩০২ ধারায় এই পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদন্ড এবং ২০১ ধারায় লাশ গুমের অভিযোগে সাত বছর সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে বিচারিক আদালত কর্তৃক দেওয়া এই রায় কার্যকরে ডেথ রেফারেন্স আসে হাইকোর্টে।
দীর্ঘ সাত বছর পর দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। পরে বিশেষ বেঞ্চে এই মামলার ডেথ রেফারেন্সের উপর শুনানি হয়। শুনানি শেষে দুটি মামলায় রায় ঘোষণা করল হাইকোর্ট।

